চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা ডাস্টবিনের উপচে পড়া আবর্জনার মতো

ক্লাস শেষে বের হতেই চমকে গেলাম আরে উৎপল না! উৎপলই তো। জোর কদমে হাঁটা শুরু করি ওকে ধরার জন্য একটুর জন্য সে মিস হয়ে গেল ট্র্যাফিক লাইটের কারণে, আমি এপাশে লাইট সবুজ হবার অপেক্ষায়, দেখি উৎপল হেঁটে চলেছে সিক্সথ আভিনিউয়ের দিকে। আমি দাঁড়িয়ে ভাবছি ইস সারা দেশের মানুষ উৎকণ্ঠায় আর এই ছেলে ম্যানহাটানের পথে পথে। ও কেন নীরবে এদেশে এসেছে। বাড়িতে কাউকি জানায়নি কেন? ওর পরিবার, আত্মীয় বন্ধু সবাই ওকে নিয়ে ভাবছে। লাল বাতি সবুজ হতেই দৌড় লাগাই, না দৌড়ালে ওকে ধরা যাবে না। প্রায় এক ব্লক আগে সে। কাছাকাছি হতেই উৎপল দাঁড়াও বল্লেও থামে না। হাঁপাতে হাঁপাতে পিছনে থেকে ছেলেটির হাত ধরি। খুব আশ্চর্য হয়ে ছেলেটি বলে এক্সকিউজ মি! হু আর ইউ? আমি জবাব দেব কি চোখে পানি এসে গেছে। ম্যাক্সিকান ছেলেটি প্রায় উৎপলের মত দেখতে। শুধু লম্বা একটু লম্বা ও উজ্জ্বল গায়ের রং। শীতবস্ত্রের ভারে বুঝতে পারিনি। আমি তাকে সরি বলে বললাম, তুমি দেখতে আমার ছোট ভাইয়ের মত। তাকে ভাবে আমি তোমাকে নক করেছি। তুমি কিছু মনে করো না। ছেলেটি ইটস ওকে বলে চলে গেল। আমি স্থানুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।

উৎপল আমার কেউ না, আমি দেশ ছাড়ার কিছু দিন আগে তার সাথে পরিচয় হয়, কয়েক বছরের জুনিয়র, চোখে মুখে উজ্জ্বলতা, হাসি খুশি, চঞ্চল ছেলেটি। প্রথম দেখায় আপন করে নেবার মত। যদিও এরপর দুই কি তিনবার দেখা ও কথা হয়েছিল। ফেসবুকে থাকার কারণে সবার সব খবর পাওয়া যায়। উৎপলের খবরটাও পেয়েছিলাম। ভিতরে যে ক্ষরণ হচ্ছিল তা হুট করে টের পেলাম উৎপল সাদৃশ্যের ছেলেকে দেখে, তাই স্থান,কাল ভুলে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি একজন স্বল্প পরিচিত ছেলের জন্য এতো ব্যাকুল হয়ে টের পেলাম, ওর মা কি নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। হয়ত মরেই গেছেন শুধু শারীরিকভাবে বেঁচে আছেন ছেলের নিখোঁজ হবার পর। মায়ের কষ্টের বর্ণনা করা কারো পক্ষে সম্ভব না।

বিজ্ঞাপন

আমি তখন ছোট, স্কুলে পড়ি, আমার বড়ভাই আমেরিকা আসলো লেখাপড়ার জন্য, ওহাইয়ো অস্ল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে। আমার মা কেঁদে কেঁদে চোখ ভিজাতেন, নামাজের পাটিতে বসে দোয়া করতে করতে কেঁদে বুক ভিজাতেন, ভাইয়ার পছন্দের কোন খাবার রান্না হত না বাসায় আর হলেও মা খেতেন না। ভাইয়া প্রতিমাসে দুইটা করে চিঠি দিত আর প্রতি সপ্তাহে ফোন। তারপরো মা অস্থির হতেন, টেনশন করতেন ভাইয়াকে নিয়ে প্রতিক্ষণ। সেখানে আমাদের উৎপলের মা একমাস ধরে ছেলের কোন খবর জানেন না। জানেন না কোথায় আছে? কারা নিয়ে গেছে? কেন নিয়ে গেছে? কি অবস্থায় আছে ছেলেটি? উৎপলের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী সবাই না জানি কেমন উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে।

উৎপলের খোঁজ পাবার আগেই আরেকটি ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেল, মোবাশ্বর হাসান। একজন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, গবেষক। তার খবরের রেশ কাটার আগেই প্রকাশক তানভির ইয়াসিন করিম নিখোঁজ। নরওয়ের নাগরিকের চুরি যাওয়া ব্যাগ একদিন পরেই উদ্ধার করে দিল যে পুলিশ, সেই পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী কি আস্ত মানুষগুলোকে খুঁজে পাচ্ছে না? বিগত বছরগুলিতে অনেক মানুষ গুম হয়ে গেছে, এতোদিন হয়ে গেল এই মানুষগুলি কোথায় হারাচ্ছে? কেন হারাচ্ছে? কিভাবে হারাচ্ছে? কাদের জন্য হারাচ্ছে? দেশের দায়িত্বে প্রাপ্ত কারো কি কোন দায় নেই? তারা দিনের পর দিন কি সুন্দর নিরুদ্বেগ বসে আছে। দেশের প্রতিটা মানুষের দায়িত্ব নিয়ে সোনার পালঙ্কে গা এলিয়ে বসে থাকার কি মানে। আমাদের কষ্টের কথা কি সরকারের কানে পৌঁছে না। সন্তানহারা মায়েরদের কান্না ও আর্তনাদ কি তাদের বিচলিত করে না। এরা শুধু নিয়োজিত আখের গোছানোর তরে। আখের কি গত নয় বছরে গোছানো হয়নি। একটু হলেও মানুষের কথা ভাবুন। আমরা অনেক কষ্টে আছি, চাকরির কষ্ট, দ্রব্যমূল্যের কষ্ট, নিরাপত্তার কষ্ট, দুর্নীতির কষ্ট, ঘুষের কষ্টে, চিকিৎসার কষ্টে, অনিয়মের কষ্টে, শিক্ষার কষ্টে, বাসস্থানের কষ্টে, আমরা আছি ধর্মের বাড়াবাড়ির কষ্টে, ধর্মের মিথ্যে দোহাই দিয়ে চলছে গুম, চলছে বাড়িঘর পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়া, খোলা তরবারি নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে জবাই। এসব অন্যায় নিয়ে মুখ খুললেই চলছে, হত্যা, ধর্ষণ, খুন গুম। আমাদের সদা বিপদে রেখে আপনারা সন্তানদের বিদেশে নিরাপদে রাখেন দুধে ভাতে, রাখেন বিত্তবৈভবে। দেশে আপনারা থাকেন নিরাপত্তা মোড়কে। আমাদের নিরাপত্তাহীনতার কষ্ট কেউ বুঝতেই পারছেন না সরকার মশাই। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আপনারা নিরাপদ, নিরাপদ আপনাদের বেতন, আনন্দ বিনোদন, বিদেশ সফর, আপনাদের ছয়বেলার খাবার। বিনিময়ে কিন্তু আমরা চেয়েছি একটু নিরাপত্তা সেটুকুও আপনারা দিতে পারছেন না। তাহলে কেন ক্ষমতা আঁকড়ে বসে আছেন। আপনাদের এই অকর্মণ্যতার বিরুদ্ধে কথা বললেই কি মানুষ কে হতে হবে গুম, তারপর খুন, কিছু দিন পর পাওয়া যাবে বেওয়ারিশ লাশ, তালিকা দীর্ঘ হয়ে চলেছে। নিখোঁজের তালিকা হাতে খুঁজবো স্বজন।

আপনাদের সব অন্যায়-অনিয়ম মাথা পেতে নিয়েও কেন দিনের পর দিন মা’দের কাঁদতে হয় সন্তানের জন্য। আমাদের বাবাদের কেন হাহাকার করতে হয়? ভাইবোনেরা কেন বুকে পাহাড়সম বেদনা নিয়ে দিন পার করে? আমাদের মায়েরা কেন কাঁদবে নিখোঁজ সন্তানের জন্য। সন্তানহারা মায়ের কষ্ট কি আপনারা বুঝবেন? আপনারা বুঝলে তো সন্তান হারাতোই না একের পর এক। নাকি বিগত সরকারের সাথে আপনারাও পাল্লা দিয়ে চলেছেন যে কে কত গুম করতে পারে! কিছুদিন আগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের গুম, খুন ও সন্ত্রাসের রেকর্ড কেউই ভাঙতে পারবেনা। তাই কি চলছে রেকর্ড ভাঙ্গার কাজ? (সুত্রঃ বাংলানিউজ, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭)
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা আর কি বলবো? তারে নাচে প্রভু যেমন নাচায়। নাইলে আইজিপি সাহেব কেমন করে বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে গুম চলে আসছে। কিন্তু এখন সময়ের পরিবর্তনে তার ধারা পাল্টেছে।

প্রায় ১২ বছর আগে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ বলে দাবি তুলেছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেন। সেই দাবিই আজ আরো প্রকট, বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে উঠেছে। সারাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি, যা উপেক্ষা করতে পারে না কোনো গণতান্ত্রিক সরকার। কিন্তু অবাক হয়ে আমরা দেখছি অপহরণ, গুম, নির্যাতন বন্ধে সরকারের ব্যর্থতা সীমাহীন। চলছে সরকার ও বিরোধীদলের দোষারোপ। একে অন্যকে ঘায়েল করে ছাড়ছে কালো ধোঁয়া, এই ধোঁয়ার আড়ালে কি হাসিল করছে তারা?

সব অন্যায়ের প্রথম প্রকাশ জানি সাংবাদিক সমাজের মাধ্যমে। আজ অধিকাংশ সাংবাদিক কলুষিত দলাদলির দোষে। বুড়িগঙ্গার জলে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে হয়েছে দলকানা। গাড়ি, বাড়ি, অর্থ, বিদেশ ভ্রমণ, প্লট, ব্যবসা, টেন্ডার, সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তির সুবিধা নিতে নিতে তাদের বিবেক গোড়ালিতে এসে থমকে গেছে। এদের ধর্ম এখন নিলাজ পক্ষালম্বন অন্যায়কারীর। অন্যায়ের প্রতিবাদে নীরব সাংবাদিকরা উৎপলের ফিরে আসার জন্য দেয় না অল্টিমেটাম। আজ যারা আমি তো নিরাপদে আছি ভেবে নিরুদ্বেগ থাকছে, আগামীতে আমরা কি তাদের বিপদে নিরুদ্বেগ থাকবো? অন্যায়ের প্রতিবাদ না হলে কাল আপনার উপরে আঘাত আসবে, আপনি আমিও গুম হব, অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে মুখ খুলুন।

আমাদের প্রতিবাদ করার, সত্য বলার মানুষ বিরল। ‘রাজা তুমি নেংটু’ বলার মত সাহসী কেউ নেই। আমাদের রানীমাতা রাজার সম্পূর্ণ বিপরীত, তিনি খুব বেশি পরতে পরতে, আস্তরে আস্তরে ঢাকা, ঢাকা একদল তোষামোদকারী দিয়ে, এতো আস্তর ভেদ করে তার কানে পৌঁছায় না সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, বাবার কান্না, আমাদের বঞ্চনার কথা। আমাদের প্রতি নিরন্তর ঘটে চলা অন্যায়ের খবর, আমরা পড়ে থাকি দেশে রাস্তায় ডাস্টবিনের উপচে পড়া আবর্জনার মতো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন