চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবো?

লেখক ও চিন্তাবিদ নীরদচন্দ্র চৌধুরী তার অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে যথার্থ কারণেই বাঙালিকে অভিহিত করেন ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ হিসেবে। এমনটি বলার ঢের ঢের কারণ রয়েছে। এক ধরনের পাখি আছে, নির্দিষ্ট একটা সময়ে আত্মহত্যা করার জন্য উম্মাদ হয়ে যায়।

কেন যায়, এর সঠিক কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই।  জাতি হিসেবে আমরাও কি তেমনি আত্মবিনাশী হয়ে পড়েছি? নতুবা চারপাশে আমরা কেন গড়ে তুলছি মৃত্যুর ভয়াল সব ফাঁদ? প্রতিদিনই এ ফাঁদে কাউকে না কাউকে অকালে জীবন দিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা কি ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান’? বড় কোনো অভিঘাতেও আমাদের কোনো বোধোদয় হয় না।  যে কোনো দুর্ঘটনায় সাময়িকভাবে একটু উচাটন হলেও তারপর ‘ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি’।

সব কিছুই যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। নিজের জীবনকে কত তুচ্ছভাবেই না বিসর্জন দেওয়ার জন্য আমরা বরণডালা সাজিয়ে বসে আছি। এমন আত্মঘাতীপ্রবণ জাতি আর কোথাও কি দেখা যায়?

এ শহরটাকে আমরা একটি অভিশপ্ত জনপদে পরিণত করে চলেছি। এখন এখানে সবুজ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। পাখি গান গায় না। নদীও আপন গতিতে বয়ে চলে না। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এসব হয়তো একদিন প্রত্মতাত্ত্বিক জাদুঘরে দেখা যাবে। আমরা প্রকৃতির বুকে নিষ্ঠুরভাবে কুঠারাঘাত করছি।  বিহঙ্গকে তীরবিদ্ধ করছি। রুদ্ধ করে দিচ্ছি নদীর প্রবাহিণী গতিকে। এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য যেন বিরান এক লোকালয় গড়ে তোলা। যেখানে অরণ্য থাকবে না। খোলা প্রান্তর থাকবে না। ফুল ফুটবে না। স্বাভাবিক নিঃশ্বাসও নেওয়া যাবে না। থাকবে কংক্রিটের মস্ত মস্ত জঙ্গল। একটু একটু করে অনৈসর্গিক পরিবেশের দিকে কি এগিয়ে যাচ্ছি না? যেদিকে চোখ যায়, শুধু ইট-পাথর-সিমেন্টের সুষমাহীন অরণ্য।

আমাদের এ নগরকে গড়ে তুলছি ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে। মৃত্যুর কত পসরাই না সাজিয়ে রেখেছি।  বেপরোয়া গাড়িকে আমরা একদমই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ট্র্যাফিক আইনের পরোয়া করছি না। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল একদমই থামছে না। এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে কারও কোনো হেলদোল নেই।

আমরা নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করতে চাই না। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বড় ধরনের ক্ষতিকর যে কোনো কাজ করতে আমাদের বিবেক একটুও কাঁপে না। অট্রালিকায় এ শহরের অবয়ব ঢেকে ফেলছি। ভবন নির্মাণের কোনো নিয়ম-কানুনই মানতে চাইছি না।

বিজ্ঞাপন

যে কারণে আগুনে জ্বলছি। পুড়ে মরছি। ধসে পড়ছি। গণ আত্মহত্যার নতুন এক পথ খুলে দিয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। গ্যাস সিলিন্ডার বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটিকে ‘চলন্ত বোমা’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। সুলভ জ্বালানি হিসেবে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) যানবাহনে এবং লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।

এ কারণে ব্যবহার করতে হয় গ্যাস সিলিন্ডার। সব ধরনের নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর এলপিজি ও সিএনজি গ্যাসের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে খরচের সাশ্রয় হওয়ায় গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেই অনুপাতে বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের প্রধান কারণ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম-কানুন না মানা, উন্নতমানের সিলিন্ডার ব্যবহার না করা, অন্ততপক্ষে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা না করা এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা।

গ্যাস সিলিন্ডার খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়। সামান্য খুঁত থাকলে কিংবা সেফটি ক্যাপ না লাগালে যে কোনো সময় জীবনমৃত্যুর দোলায় দুলতে হবে। বেঁচে গেলেও সারা জীবনের যে ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়, তাতে সুস্থ-সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব হয় না।

তারপরও কেন জানি এ বিষয়টিকে আমরা একদমই গুরুত্ব দিচ্ছি না। এটা যে কী ভয়াবহ, সেটা কি আমরা অনুধাবন করতে পারছি না? না হলে এ ব্যাপারে আমরা উদাসীন ও নির্বিকার থাকি কীভাবে? গ্যাস সিলিন্ডার শুধু কোনো নির্দিষ্ট বাসায় বসবাসকারী কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির আরোহীর মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে আসে না, আশেপাশে যারা থাকবেন, তারা কেউই কিন্তু নিরাপদ নয়।

ঘরে যেমন নিরাপদ নয়, বাইরেও নয়। মৃত্যু তো যে কোনো মুহূর্তেই হতে পারে, এটা তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পিছে পিছে ধাওয়া করছে মৃত্যুর জ্বলজ্যান্ত হুমকি। এমন হুমকি নিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব?

এখনও সীমিত পরিসরে দুর্ঘটনা ঘটলেও আগামীতে এ ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিক মুনাফার জন্য সিলিন্ডার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যন্ত্রাংশ যথাযথ নিয়ম না মেনে নির্মাণ ও সংযোজন করা হচ্ছে। নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে।  পুনঃপরীক্ষা করা হচ্ছে না। অথচ একটুখানি হেরফের হলে বিস্ফোরণ ঘটতে মোটেও সময় লাগে না।  সিলিন্ডার ব্যবহারের মেয়াদ যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে দুর্ঘটনার হুমকি। অরক্ষিত সবার জীবন। তবুও আমাদের ঘুম ভাঙছে না।

দুই অলসের বিখ্যাত সেই গল্পের কথা মনে পড়ছে। ঘরে আগুন লেগেছে। শুয়ে থাকা দুজন কুঁড়ে কিছুতেই উঠবে না। এমনকি কথা বলতেও তাদের রাজ্যির আলস্য। একজন আরেকজনকে সংক্ষেপে বলছে, পি. পু.। মানে পিঠ পুড়ছে। এ কথা শুনে তার সাগরেদ বলছে, ফি. শু.। অর্থাৎ ফিরে শুই। আমরা সবাই যেন পাশ ফিরে শুয়ে থাকছি। পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাইছি না। আমাদের কি কখনোই চৈতন্যোদয় হবে না?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View