চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো: সুজন

রাজনীতির খেলায় কোন দল হারলো, কোন দল জিতলো সে সব নিয়ে সাধারণ মানুষের খুব একটা আগ্রহ নেই। কিন্তু ক্রিকেটের খেলায় কে হারলো, বা কে জিতলো অর্থাৎ বাংলাদেশ কী করলো সেটা নিয়ে কিন্তু মানুষের ভীষণ আগ্রহ আছে। বাংলাদেশ টিম হেরে গেলে কষ্টে থাকে ১৭ কোটি মানুষ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে। কী কারণে আমাদের ম্যাচগুলো এত খারাপ হলো। পারফরম্যান্স কী ছিল, আমাদের গাফিলতিগুলো কী ছিল, জটিলতাগুলো কী ছিল, ঘাটতিগুলো কী ছিল, বাধাগুলো কী ছিল? জাহিদ নেওয়াজ খানের পরিকল্পনায়, সোমা ইসলামের উপস্থাপনায় আমার প্রযোজনা চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান টু দ্য পয়েন্ট এসে ক্রিকেটের নানান বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ দলের টিম ডিরেক্টর, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন।

শুরুতেই আপনার কাছে জানতে চাই, ক্রিকেটে হেরে গেলে বাংলাদেশের মানুষ ভীষণ কষ্ট পায়। আপনারা কী কষ্ট পান? এ প্রসঙ্গে খালেদ মাহমুদ সুজন বলেন, অবশ্যই কষ্ট পাই। ক্রিকেটের সাথে আমাদের জীবন। আমরা তো ছোটবেলায় বেড়ে ওঠেছি ক্রিকেট খেলা নিয়ে। এখনো ক্রিকেটের সাথেই আছি। ক্রিকেট আমাদের পেশা। ক্রিকেট আমাদের সব কিছু। ক্রিকেটের জয় পরাজয় তো আমাদের জন্য অনেক কিছুই । পরাজয় মানেইতো আমাদের জন্য বেদনা।

ক্রিকেটে হেরে গেলে আমরা কষ্ট পাই, আপনারাও কষ্ট পান। কিন্তু এই হারটা কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে খালেদ মাহমুদ বলেন, ওভারঅল আমরা ভালো খেলতে পারিনি। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে বাংলাদেশ দল সব সময় যেভাবে খেলে দল হিসেবে আমরা সেই রকম খেলতে পারিনি।

দল হিসেবে আমরা ভালো খেলতে পারি নাই কেন? এ প্রসঙ্গে খালেদ মাহমুদ সুজন বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে একটা মেন্টাল চাপ বাংলাদেশের ধরে বসেছে। আপনি দেখেন ওমানে যাওয়ার পর থেকে দুটি প্র্যাকটিস ম্যাচে আমরা হারলাম। কোয়ালিফাই ম্যাচেও আমরা হারলাম। ১৪৪ রান টপকাতে পারলাম না। পরের দুটা ম্যাচ জিতে আমরা সুপার টুয়েলভে যাই। প্রথম ম্যাচটার পর থেকে বাংলাদেশ দল ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি। ঐ ম্যাচটা আমাদের জেতা উচিত ছিল। এখানে আমাদের দল নির্বাচন থেকে ছোট ছোট ডিসিশন ভুল ছিল। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শেষ দুই ম্যাচে দলের বাইরে চলে যান সাকিব আল হাসান। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত দলটিকে টেনে তুলতে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দর্শক হিসেবে খেলা দেখতে হয়েছে বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডারকে।

যদিও সেমিফাইনালের আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশ দলের; কিন্তু কি কারণে লম্বা সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, সে বিষয় নিয়েই এখন বেশি করে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি অধিনায়ক হিসেবে মোহাম্মদ নবীর নিজ খরচে পুরো আফগানিস্তান দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সঙ্গে টাইগার অধিনায়কের পেইন কিলার নিয়ে খেলা আর মুশফিকুর রহীমের আয়নায় নিজের চেহারা দেখানোর কথাগুলো মাঠের ক্রিকেটকে ছাপিয়ে গেছে। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ের দগদগে ক্ষতটা যেন শুকাতেই চাইছে না। টি-টোয়েন্টি খেলার মানসিকতা না থাকার সঙ্গে কিছু নিয়মিত ভুল আর দুর্ভাগ্যকে সঙ্গী করেই হতাশার রাস্তায় হেঁটেছে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ পর্বে টানা চার ম্যাচ হেরে সেমিফাইনালে যাওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ৩ রানে হেরে একেবারে তীরে গিয়ে তরী ডুবে টাইগারদের। এর আগে বাংলাদেশের ভুলের সূত্রপাত হয় প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই। শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে হারার পর সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকলেও, এই হারকে পাত্তাই দেয়নি বাংলাদেশ। সেখান থেকে কোনো শিক্ষাও নিলেন না। মাঠের ক্রিকেটে ব্যর্থতার পাশাপাশি মাঠের বাইরেও ভালো নেই বাংলাদেশের ক্রিকেট। কথার লড়াই, মান-অভিমানের ছড়াছড়িতে কখনো বোর্ড কর্মকর্তা, কখনো আবার সরব দেখা যায় ক্রিকেটারদের।

সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন এ বিষয়ে বলেন, একটা জবাবদিহিতার জায়গা তো ক্রিকেটারদের থাকা উচিত, তাই না। কারণ ওরা তো বোর্ডের বেতনভুক্ত। চাকরিতে কেউ ভুল করলে এর জবাবদিহিতা চাওয়া হয়, সেখানে ক্রিকেটাররা তো বাইরের কেউ নয়।

অথচ সুজনের পাশাপাশি সাকিব আল হাসানও প্রত্যাশা করেছিলেন, বাংলাদেশ এবার সেমিফাইনালে খেলবে। ওমানের মাসকটে স্কটল্যান্ডের কাছে হারের পর স্বাগতিক ও পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে জয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পর সাহস বেড়ে গিয়েছিল টাইগারদের। এরপর শ্রীলঙ্কার কাছে ভুল, ইংল্যান্ডের কাছে সামর্থ্য ও ভাগ্য সহায় না থাকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হারতে হয়েছে টি-টোয়েন্টি খেলার মানসিকতা না থাকার কারণে। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে হারের পর মানসিকভাবে বিষণ্ন ছিলেন ক্রিকেটাররা। সর্বোচ্চটা দেওয়ার পরেও ম্যাচের শেষ বলে এসে হারতে হয়েছে। ব্যাটিং ও বোলিং এ ব্যর্থতার পাশাপাশি ক্যাচ মিস ছিল চোখে পড়ার মতো।

সুপার টুয়েলভ পর্বে বাংলাদেশ দল রীতিমত বিধ্বস্ত হয়ে এবারের বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ দলের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্সের ছাপ ছিল ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাতেও। ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিং- মনে হয়েছে মাঠে নামার আগেই হেরে বসেছে গোটা দল। হারের ধরণ আর ক্রিকেটারদের কৌশল পছন্দ হয়নি খালেদ মাহমুদ সুজনের।

জাতীয় দলের টিম ডিরেক্টর হিসেবে সকল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুজনকে। সে দায়িত্ব সামলানোর কাজ শুরু করেছেন তিনি। সুজন বলেন, ক্রিকেটে অভিনয়টা খুবই প্রয়োজন। যা বিশ্বকাপে করতে পারেননি ক্রিকেটাররা।

বিজ্ঞাপন

‘মানসিক ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তবে আপনি পারফর্ম করলে ভালো থাকবেন, না করলে শিখতে হবে। আমরা ক্রিকেট খেলায় একটা কথা বলি সবসময়, ক্রিকেটে অভিনয়টা খুবই প্রয়োজন। আপনাকে কখনো কখনো অভিনয় করতে হবে যে আপনি আত্মবিশ্বাসী এবং এভাবেই ব্যাটিং করতে চান।’

‘একটা ছেলে প্রতিদিনতো রান করবে না। কিন্তু আত্মবিশ্বাস তো গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক ব্যাপারটা জরুরী, আমি যদি প্রতি ম্যাচে নিজের ব্যাটিং স্টাইল পরিবর্তন করি তাহলে কঠিন। চাপের মুহূর্তে আমাকে ভিন্ন ধরনের ব্যাটিং করতে হবে কেন? আমার নিজের তো একটা সেটাপ আছে যে কীভাবে রান করতে পারেন।’

সুজন মনে করেন আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের সঙ্গে খেলার কৌশলটাও জানতে হবে ক্রিকেটারদের।
সুজনের ব্যাখ্যা, ‘টি-টোয়েন্টি অল্প বলের খেলা, আপনাকে আক্রমণাত্মক থাকতেই হবে। আপনি যদি শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ডের কথা বলেন দেখেন উইকেট যাওয়ার পরেও তারা ইতিবাচক। আপনি বেশ কিছু বল ডট দিয়ে পরে আক্রমণাত্মক হলে কঠিন। যে উইকেটেই খেলেন ১৪০-৬০ এর নিচে হলে কাজটা সহজ হয় না।’

জাতীয় দলের ‘টিম ডিরেক্টর’ নতুন এই দায়িত্বকে কীভাবে দেখছেন? এ প্রসঙ্গে খালেদ মাহমুদ বলেন,
এটা আমার জন্য তেমন নতুন কিছু না। আমি এর আগেও এমন দায়িত্বে ছিলাম। হয়তো নামটা ভিন্ন ছিল। এবার কাজের ধরনটা কী হবে, আমি বোর্ডের কাছে পরিষ্কার হতে চেয়েছি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কতটা অবদান থাকবে, এসব বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে কাজ করছি। যেহেতু এখন কোনো কোচ নেই দলের সঙ্গে। নির্বাচকেরা দেখতে চেয়েছিল ওরা কী অবস্থায় আছে।

খালেদ মাহমুদ বলেন,এর আগেও প্রায় একই দায়িত্বে জাতীয় দলে কাজ করেছেন। এবার কাজের ধরনে কী পার্থক্য থাকবে?

খালেদ মাহমুদ বলেন, পার্থক্য থাকবে। কিছু জিনিস আমার এখতিয়ারে থাকবে। আমাকে বলা হয়েছে, কাজের পরিধিটা একটু বাড়বে। সেটা কী, তা আমি এখনই বলতে চাই না। আমি চাই বিষয়টা আনুষ্ঠানিকভাবে আসুক, তাহলে ভালো হবে। তবে কোচিংয়ে আমার কোনো দায়িত্ব থাকবে না। দলের ব্যবস্থাপনা করা, নির্বাচনপ্রক্রিয়া দেখা, পরিকল্পনা করা এসবই হবে আমার দায়িত্ব।

আপনি যখন দলের ম্যানেজার ছিলেন। তখনো জাতীয় দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আপনিই নিতেন
এ বিষয়ে মাহমুদ বলেন, হাথুরুর সঙ্গে আমি যেভাবে কাজ করেছি, এবার অনেকটা সে রকমই হবে। তার সঙ্গে আমার রসায়নটা ভালো ছিল। সে আমাকে বিশ্বাস করত। কোচের সঙ্গে এই বিশ্বাসের ব্যাপারটা থাকতে হবে। কোচকে বাদ দিয়ে তো কিছু করা যাবে না।

রাসেল ডোমিঙ্গো ক্ষেত্রেও একই রসায়ন প্রত্যাশা করছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদ বলেন,
ডোমিঙ্গোর সঙ্গে আমি অল্প কিছুদিন কাজ করেছি। তখন আমি তাকে খুব ভালো করে জানতাম না। কাজের ধরনও বুঝতাম না। আমার মনে হয় আমাদের দুজনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতির সুযোগ আছে।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এমন পারফরম্যান্সের পর বাংলাদেশ দলে কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান?- এমন প্রশ্নের উত্তরে খালেদ মাহমুদ বলেন, আমরা ভালো খেলিনি, এটাই শেষ কথা। আমাদের টি-টোয়েন্টির কাঠামোটা কী, কীভাবে খেলতে চাই, প্রতিপক্ষ কীভাবে খেলছে এসব নিয়ে কাজ করতে চাই। আমাদের একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কারণ, আপনি তো বলেকয়ে একজন ব্রায়ান লারা, সচীন টেন্ডুল্কার, জস বাটলার তৈরি করতে পারবেন না। এটা সময়ের ব্যাপার। আমরা সেই পথেই এখন এগোতে চাই।

পাকিস্তানের সাথে আমরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবো?

এই প্রসঙ্গে খালেদ মাহমুদ সুজন বলেন, অবশ্যই আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। আমি মনে করি আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর মতো এ্যবিলিটি আছে। ক্রিকেট বোর্ড সবাইকে এক হয়ে সম্মলিত ভাবে কাজ করতে হবে। ওরা যেহেতু মাঠে খেলে ওদের কমিটমেন্টটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কোচদেরও সে রকম প্লানিং করা টিম সিলেকশন এইসব ব্যাপারগুলো খুবি জরুরি আমি মনে করি।

বিজ্ঞাপন