চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আবার কাজের লোকগুলোকে নিয়ে সামনে আগাতে চাই: শাকিব

‘সবকিছুর উপরে কাজ থাকতে হবে। কাজ ছাড়া শিল্পী মূল্যহীন। আশা করছি, আবার সেই আগের উৎসব ফিরিয়ে আনতে পারবো’

‘আমরা যারা অভিনয় শিল্পী তাদের মেকআপ করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়। এই মেকআপ কিন্তু নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত থাকে। এরপরই গলে গলে পড়ে যায় বা তুলতে হয়। মেকআপ উঠে যাওয়ার পরই আসল চেহারা বের হয়ে আসে। সমাজের ক্ষেত্রটাও ঠিক এমন। সমাজে যারা মুখোশ পরে থাকে বা চারপাশে এমন কিছু জাল বিছিয়ে রাখে যাতে অন্যরা তাকে তার জন্য আশির্বাদ মনে করেন। আসলে তাদের মধ্যে এমন কিছুই নেই, যখন তার মুখোশ ও চারপাশের মিথ্যেগুলো খুলে পড়ে তখন তাদের আসল রূপ বের হয়ে আসে। তখন তারা পাশে কাউকে পাশে পায় না। আমাদের চলচ্চিত্রেও কিছু এমন মানুষ রয়েছে ধীরে ধীরে তাদের মুখোশ খুলছে। তাদের জন্য যে কত কত মানুষ বেকার হয়ে বসে আছে তা হয়তো তারা নিজেরাও জানেন না। কেবল নিজের স্বার্থের কথাই ভেবেছেন তারা। এখন সময় পাল্টে যাচ্ছে। কিসে চলচ্চিত্রের উন্নতি আর কিসে চলচ্চিত্রের মানুষ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারবেন সেটা অনেকেই বুঝছেন।’

দিনদিন ছবির সংখ্যা কমে যাওয়া, চলচ্চিত্রের অধিকাংশ শিল্পীর হাতে কাজ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে এসব কথা বলেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের বরপুত্র নায়ক শাকিব খান।

‘একটু প্রেম দরকার’ ছবির দৃশ্যে শাকিব খান

দেশের চলচ্চিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই নায়ক গত দুই বছর কাজ করেছেন কলকাতাতেও। ওই ছবিগুলো শাকিব খানের জনপ্রিয়তাকে ভারত-বাংলাদেশের সব শ্রেণির দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করেছে। তবে ‘ভাইজান এলো রে’ ও ‘নাকাব’-এর পরে কলকাতার আর কোনো ছবিতে কাজ করেননি শাকিব খান।

বর্তমানে তিনি দেশীয় প্রযোজনার ছবি ‘একটু প্রেম দরকার’ এবং ‘শাহেনশাহ’-তে টানা কাজ করছেন। অনেকের মনে প্রশ্ন শাকিব খান কেন কলকাতার লোকাল প্রোডাকশনের ছবি কিংবা যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজ করছেন না? দেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই নায়ক এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

মঙ্গলবার রাতে দীর্ঘক্ষণ আলাপে শাকিব খান বলেন, কলকাতার দুই ছবি আমি নিজেই ছেড়ে দিয়েছি। ওই সময়টা আমাদের দেশের লোকাল দুই ছবির পিছনে দিয়েছি। তখন আমি অনেক হিসেব করছি। আমি তখন যদি বাংলাদেশের দুই ছবি না ধরতাম; এদিক সেদিক করে কাটিয়ে দিতাম তবে গণমাধ্যমেই প্রচার হতো যে, দেশের কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে না। আমি তখন ইন্ডিয়া, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া যেখানেই থাকতাম এটা শুনে শান্তি পেতাম না। দেশের বাইরে আমার যারা কলিগস রয়েছে, বা ইন্ডাস্ট্রির আরও মানুষরা বলতো আমি যে দেশের সুপারস্টার সেই দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো সিনেমাই হচ্ছে না।

পাশ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে শাকিব খান বলেন, দুর্দশা কিন্তু ওখানেও কম নয়। আমাদের চেয়ে সেখানে ভয়ঙ্কর দুর্দশা। তবে সেখানে ছবি হচ্ছে। কম বাজেটে, অফট্রাকের ছবি হচ্ছে। ওখানে সবাই কমবেশী কাজ করছে। কেউ বসে নেই। কাজ কম থাকলে মৌসুমি স্টেজ শো করছে। আমাদের দেশের খুব বেশী বাজেটের ছবি হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কম বাজেটে কনটেন্ট বেজ ছবি হোক। কিন্তু সিনেমা তো হোক! আমার ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের কাজ কমে যাচ্ছে। এর কারণ হলো, আমাদের এখানে বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পাশের দেশে ইন্ডাস্ট্রি একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে।

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নায়ক বলেন, ইন্ডাস্ট্রি এখন ভীতিকর অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে। আগে সবাই মায়াপুরী বলতো, এটা এখন ভয়ঙ্করপুরী হয়ে গেছে। আগে আড্ডা হতো, কাজ হতো, কতো মানুষ আসতো, এফডিসির মধ্য ছিল বাইরের মানুষদের স্বপ্নের জায়গা। কত বড় বড় মানুষ এখানে শুটিং দেখতে আসতো। একটা আনন্দের জায়গা ছিল। সব শ্রেণির মানুষ পিকনিকের ফিল নিতো। এখন তারা ভুলেও এফডিসির ত্রিসীমানায় ভিড়তে চায় না। কারণ, এখানে এলেই ঝামেলায় পড়তে হয়। কেন ওইসব সৌখিন মানুষগুলো শুধু শুধু নিজেদের বিপদ ডেকে আনবে?

শাকিব খান বলেন, হ্যাঁ, তারা আসবে যদি পরিবেশ সুষ্ঠু থাকে। আগের ওই অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সবার হাতে কাজ থাকতে হবে, একের পর এক শুটিং চলতে হবে। না হলে মানুষ কেনোই বা আসবে! এজন্য আগে আস্থার জায়গাটা দরকার। এফডিসি যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র না এটা আনন্দের জায়গা এটা সবাইকে বুঝাতে হবে। কেউ উপরে উঠতে চাইলে তাকে টেনে নিচে নামানোর ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি টানা দুইবার শিল্পী সমিতির সভাপতি ছিলাম। ওই সময়ে কত অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন শিল্পীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি তো কখনই কাউকে বয়কট করিনি। শোকজ করে বাসায় চিঠি পাঠাইনি, ডেকে এনে বিচার করিনি। বরং অভিযোগ এলে দুপক্ষকে বসিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছি। শিল্পীদের কাজ যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, শিল্পী সত্তাই তো থাকবে না।

একযুগের বেশী সময় ধরে চলচ্চিত্রের শীর্ষ আসন ধরে রাখা এই তারকা বলেন, আমি যখন ছিলাম তখন সবাই তো কমবেশী কাজ করতো। বছরে আমি ৮-৯ টা ছবি করতাম, বাকি সবার কাছেও কাজ থাকতো। এখন চিত্রটা কেমন? হিসেব করলে তো খারাপ লাগে। সিনেমার অবস্থা এতো খারাপ ছিল না। এখন ইন্ডাস্ট্রির চাকা অচল হয়ে গেছে। তাই আমি নতুন করে কিছু না করলে ইন্ডাস্ট্রির চাকা সচল হবে না। আবার কাজের লোকগুলোকে নিয়ে সামনে আগাতে চাই। শুটিং করতে গেলে যেন বাঁধা না আসে, ইনিউট সমস্যায় না পড়ে সেটা নিশ্চিত করতে চাই। সবকিছুর উপরে কাজ থাকতে হবে। কাজ ছাড়া শিল্পী মূল্যহীন। আশা করছি, আবার সেই আগের উৎসব ফিরিয়ে আনতে পারবো।

ছবি: নাহিয়ান ইমন