চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আনিয়েস ভারদা: জীবনকে উপভোগ করে গেছেন, বেদনাকেও

আনিয়েস ভারদার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী সোমবার:

‘নারী-অধিকারের জন্য আমাকে অধিকাংশ নারীর সাথেই যুদ্ধ করতে হয়েছিল’

বর্ণাঢ্য সৃজনশীল ও নিরীক্ষাধর্মী এক স্রষ্ঠার নাম আনিয়েস ভারদা। বেলজিয়াম বংশদ্ভূত এই ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা শুরুর দিকে হতে চেয়েছিলেন যাদুঘরের কিউরেটর। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আলোকচিত্র নিয়ে পঠন পাঠনের ফলে এ মাধ্যমেই কর্মজীবন শুরু। পরবর্তীতে ২৬ বছর বয়সে যোগ দেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। হয়ে উঠেন ফরাসি নব তরঙ্গের প্রধান চরিত্র।

বিভিন্ন পরীক্ষণমূলক কৌশল অবলম্বন করে প্রামাণ্য বাস্তবতাবাদ, নারীবাদী বিষয়াবলিসহ সামাজিক অন্যান্য বিষয়গুলো চলচ্চিত্রে তুলে ধরেন দক্ষতার সাথে। ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিলো নিবিড়।

মৃত্যুর আগে গুণী এই নির্মাতা ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। যেখানে চলচ্চিত্র নিয়ে তার আবেগ, আত্মবিশ্বাস আর যাপন নিয়ে দৃঢ়তার কথা ফুটে উঠে।

সোমবার (২৯ মার্চ) তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। অউন মায়ারকে দেয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর থাকলো এখানে:

আপনার শৈশবের সবচেয়ে দারুণ স্মৃতি কোনটি?
আমার মা-বাবা আমার নাম রেখেছিলেন আরলেতে। আমি সেটা বদলে আনিয়েস রাখি ছোটবেলাতেই। আমি নামটা পছন্দ করতাম না, কারণ এমন কোন নামই আমার পছন্দ হতো না যেটার সাথে ‘এতে’ আছে, কেমন বাচ্চা মেয়েদের নাম মনে হতো। লাফ-ঝাঁপ দিচ্ছে এরকম। এরকম বাচ্চা-বাচ্চা থাকতে আমি কখনোই পছন্দ করতাম না, সেজন্য আমি ‘আনিয়েস’ নাম রাখলাম।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

১৯৫০ থেকেই আপনি একই বাসায় ছিলেন। বাসাটা নিয়ে কিছু বলুন…
যখন এলাম, অতোটা আরামদায়ক জায়গা ছিল না বাসাটা। অপরিষ্কার ছিল, শাওয়ার পর্যন্ত ছিল না, ভাবো! আস্তে আস্তে জায়গাটাকে বদলে নিলাম আমি। যখন জ্যাক [জ্যাক দ্যমি, ভারদার দাম্পত্য সঙ্গী] আমার সাথে থাকতে এলো, আমরা দু’জনে মিলে আরও সুন্দর করে তুললাম বাসাটাকে। এখন তো একটা ছোট্ট বাগানও আছে, তিনটা বিড়াল আছে আমার। স্বর্গের মতোন অনেকটা!

আপনার কাজকে অনুপ্রেরণা যোগায় কোন জিনিসটা ?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তবতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। অনেক চলচ্চিত্র আমি নির্মাণ করেছি সাধারণ মানুষজনকে নিয়ে। আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘লা পোয়্যাঁত কুর্ত’, (La Pointe Courte)- নির্মাণের সময় জেলেদের সাথে মিশেছি। আর ‘দ্য গ্লিনার্স এন্ড আই’ (The Gleaners and I)’ যখন নির্মাণ করি তখন আমার উদ্দ্যেশ্যই ছিল সমাজের নোংরা দিক তুলে ধরা। এক চরম নোংরামি!

‘দ্য গ্লিনার্স এন্ড আই’– সেসময় থেকে অনেকখানি অগ্রসর একটা ভাবনা ছিল।
ধরতে চেষ্টা করেছিলাম, ফরাসি ভাষায় যাকে বলে ‘সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে’। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে অনেক যাচাই-বাছাই এর মধ্য দিয়ে আমি যেতে ভালোবাসি। জানিনা শুনেছো কী না, নিজের ফিল্মের প্রিন্টগুলো জমিয়ে এক স্তুপ বানিয়ে ফেলেছিলাম আমি। শেষ নির্মিত চলচ্চিত্রটা ছিল ‘Le Bonheur’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে।

‘ফরাসি নিউ ওয়েভ’-এর অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত হতে কেমন লাগে আপনার?
‘দ্য গ্র্যান্ডমাদার অব নিউ ওয়েভ!’ – কথাটাকে আমার হাস্যকর মনে হয় কারণ আমি ত্রিশ বছর বয়সি ছিলাম। ত্রুফো ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ নির্মাণ করলেন, গদার ‘ব্রেথলেস’ বানালেন। কিন্তু আমি পাঁচ বছর আগেই (১৯৫৫-তে) কাজটা করে ফেলেছিলাম আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘লা পোয়্যাঁত কুর্ত’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। আমার বয়স যখন কম তখনই আমি দেখছিলাম লেখকেরা লেখালেখির নতুন ফর্ম, নতুন ভাষা নিয়ে কাজ করছে, এই যেমন – জেমস জয়েস, হেমিংওয়ে, ফকনার। আর আমি ভাবছিলাম সিনেমার নতুন স্ট্রাকচার খুঁজে বের করতে হবে। সারা জীবনই আমি সেটাই খুঁজে গেলাম।

নারীদের গল্প কিংবা নারীদের নিয়ে গল্প বলাটা কি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আপনার জন্য?
ক্লিও নারী ছিলেন বটে! কিন্তু জানো, নারী-অধিকারের জন্য আমাকে অধিকাংশ নারীর সাথেই যুদ্ধটা করতে হয়েছিল। নারী অধিকার নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলাম। একজন গাইলেন, বাকিরা গাইলেন না (১৯৭৬)। কিন্তু আমরা বলতে পারি না যে আমরা জিতে গেছি, কারণ লড়াইটা তো এখনো চলছে। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এই যে চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে এখন বলে– ‘সিলেকশন কমিটিতে অর্ধেক নারী অর্ধেক পুরুষ রাখছি আমরা।’ কিন্তু এটা সবসময় পুরুষরাই নির্ধারণ করে কেন?

আমি শুনেছিলাম ম্যাডোনা ‘ক্লিও ফ্রম ফাইভ টু সেভেন’ রিমেক করতে চেয়েছিলেন?
ক্লিও-এর স্টোরিটা ম্যাডোনার খুব ভালো লেগেছিল। (ক্লিও-একজন মহিলা যিনি অপেক্ষা করছিলেন ক্যানসারের চিকিৎকার জন্য।) সে একজন মহিলাকে বলেছিল এটার চিত্রনাট্য লেখার জন্য। ঠিক আছে সেটা। কিন্তু ম্যাডোনার মা মারা যান তখন ক্যানসারে। এরপর সে আর এই ফিল্ম নিয়ে এগোয়নি।

বিজ্ঞাপন

আমি যদি এই সিনেমা পুননির্মাণ করতাম তবে এমন কোন নারীর কাহিনি নির্মাণ করতাম যে এইডস নিয়ে শঙ্কায় আছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেসময় এইডস এমন ভয়াবহ হুমকি ছিল। আমি হুইটনি হাস্টন-কে নিয়ে কাজ করতাম, করলে।

শুনেছিলাম জিম মরিসনের অনেক ঘনিষ্ঠ ছিলেন আপনি?
তাঁকে, তাঁর কাজকর্মকে আমি খুব পছন্দ করতাম, প্রথম ওর সাথে দেখা হয়েছিল ৬০-এর দশকে, লস এঞ্জেলেসে। তারপর তাঁকে তারকা হয়ে উঠতেও দেখলাম। সে সিনেমা নিয়ে খুব ভাবতো, আমাদের নির্মাণ-ভাবনা সম্পর্কে জানতো। আমরা মাত্র চার জন ছিলাম তাঁর শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে, প্যারিসের সিমতিয়ের দ্যু’পের লাশেজ-এ। যখন তারকারা কম বয়সে মারা যান তখন তারা আইডল হয়ে উঠেন।

ট্যাকনোলজি আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণকে কী করে প্রভাবিত করে?
২০০০ সালের দিকে, শতাব্দীর অদল-বদলের সময়। আমি নিজের জীবনকেও কিছুটা বদলে দিতে চাইলাম। আকারে ছোট, হেন্ডহেল্ড ক্যামেরাগুলো খুঁজতে থাকলাম, বুঝতে পারলাম যে একাই আমি চিত্রধারণের কাজটা করতে পারবো। এইভাবেই ‘গ্লিনার্স এন্ড আই’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলাম। মেঝেতে কুড়িয়ে পাওয়া খাবার খেয়ে জীবন চালিয়ে নেওয়া মানুষদের নিয়ে যখন কাজ করতে হয় তখন বড় একটা টিম নিয়ে কাজ করা সুবিধাজনক নয়। তাদেরকে আমি কিছুতেই অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি।

আমি এমনিতে খুব বিচক্ষণ বটে, কিন্তু অনেক পাগলামিও করতে পারি। ২০০৩ সালে ভেনিস বিয়েন্যালে-তে একটা বড় প্রজেক্ট করলাম ‘পোটেটোপিয়া’– হার্টের আকারের আলুগুলোর স্পেশালিস্ট হয়ে গেলাম। উদ্বোধনের দিন পোটেটো-কস্টিউম পরেছিলাম। লক্ষণীয় হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম তখন। এখন আমি লক্ষণীয় আমার চুলের জন্য। সাদা রঙ হওয়ার কথা ছিল চুলের, কিন্তু ফ্যান্টাসির জন্য অন্য এক রঙ করেছি চুলে। এইভাবে ‘PUNK’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে যাই, বুঝলেন? আমার নাতি-নাতনিরা যখন ছোট ছিল তখন আমাকে ‘মামিতা পাঙ্ক’ ডাকতো। মাঝে মাঝে এমন কিছু কাজ করি যা হয়তো ‘সঠিক’ না কিন্তু আমি সাহস করে সেসব করতে ভালোবাসি।

ভ্যাগাবন্ড পাঙ্ক ছিল, কাউন্টার-কালচার ফিল্ম…
না, পাঙ্ক ছিল না। এটা রাস্তার মানুষদের গল্প। সান্দ্রিন বুনে-র বয়স তখন আঠারোও হয়নি; প্রতিভাময়, স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা বিদ্রোহী। আমি উচ্ছ্বসিত ছিলাম সিনেমাটা নিয়ে, কেননা এই সিনেমাটা খুবই রিয়েলিস্টিকভাবে বলে ‘যখন তোমার কিছুই থাকবে না তখন তুমি কেমন আচরণ করবে? কোথায় যাবে? তোমার ক্রোধ, রাগ নিয়ে কী করবে তুমি?’ ভ্যাগাবন্ড- অর্থনৈতিক দিক থেকে সফল ছিল যেটা আমার অন্য কোনো সিনেমা ছিল না।

কেমন লেগেছিল সেটা?
দুঃখিত, আমি আসলে যা নির্মাণ করতে চাই, যেভাবে চাই সেভাবেই করেছি। কোন বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করিনি, কোন বিখ্যাত অভিনয়শিল্পীর সাথে খুব কমই কাজ করেছি। একবার ক্যাথেরাইন ডায়ার-এর সাথে একটা কাজ করেছিলাম, সেটা সবচেয়ে বাজেভাবে ফ্লপ একটা সিনেমা হল। সফলতার সাথে খুব কমই সংযোগ আমার। আমি চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে বরঞ্চ নিজেকে জুড়ে দিতে পারি। ২০১৭ তে উচ্ছ্বাস আর বিনয়ের সাথে অস্কার পুরস্কার গ্রহণ করলাম। বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটা ব্যাপার ছিল জানতে পারা যে আমি হলিউডে ফিল্ম-মেকার হিসেবে এক্সিস্ট করি, যদিও আমি কোন ব্লকব্লাস্টার চলচ্চিত্র নির্মাণ করিনি কখনো।

এমন কোন উপদেশের কথা মনে পড়ে যা আপনার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে ভালো উপদেশ?
ফটোগ্রাফার ব্রাসেই এর সাথে দেখা করেছিলাম একবার। তরুণ একজন ফটোগ্রাফার আমি তখন। তিনি বলেছিলেন – ‘নিজেকে সময় দাও, দেখো চারপাশ, সূক্ষ্ণভাবে দেখো।’ ধারণাটা ভালো লেগেছিল – কাজটা নয়, ব্যাপারটা হচ্ছে আপনার মাথার ভেতর কী চলছে ছবিটা তোলার আগে।

আপনার ইচ্ছা কী? কীভাবে আপনাকে স্মরণ করুক কেউ?
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি জীবনকে উপভোগ করে গেছেন, বেদনাকেও। পৃথিবীটা ভয়ানক কষ্টদায়ক, কিন্তু আমার মনে হয়েছে প্রতিটা দিন আকর্ষণীয় হতে হবে। যা যা ঘটেছে আমার জীবনের প্রতিটা দিনে– এই কাজ, মানুষকে দেখা-জানা, শোনা – সমস্ত মিলিয়ে আমার মনে হতো কী দারুণ প্রাচুর্যময় এই বেঁচে থাকা!