চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আদর্শিক নেতার আকাল দূর হবে কি?

ডাকসু এজিএসের কক্ষে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি থাকছে, আবার ডাকসু ভিপির কক্ষে কি থাকছে না? এই ছবি সংযোজন নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা চলছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও ডাকসুর এজিএস এবং ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এ ছবি লাগান।

পরবর্তীকালে ডাকসু ভবনের সংস্কার কাজ শেষ হলে সর্বসম্মতিক্রমে ডাকসুর সভাকক্ষেও জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি লাগানো হবে বলে বললেন এজিএস সাদ্দাম৷

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত বলেন, ‘ডাকসুর এজিএস নিজের অফিস কক্ষে তাদের ছবি লাগানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি প্রশংসনীয়। আমাকে জানানোর পর আমিও অনেক উৎসাহ নিয়েই সেখানে যাই।’ এখন কথা হলো এই ছবি সংযোজনের সিদ্ধান্তটা নিলো কে? সেটা কি ডাকসু নিল, নাকি ছাত্রলীগ নিল? নাকি এজিএস সাদ্দাম একা নিল?

ডাকসু নির্বাচন-শপথডাকসুর সভাকক্ষে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি স্থাপনের বিষয়ে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলছেন অন্য কথা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি লাগানোকে অবশ্যই সমর্থন করি। তবে সবার সম্মতিতে সেটি করা যায়। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় নেতা এবং শেখ হাসিনা আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বাধা থাকবে না। তবে সেটি ডাকসুর অফিসিয়াল মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো ছাত্রসংগঠন নিজেদের ইচ্ছেমত ডাকসুতে সেটি করতে পারে না৷

ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সাথে কি কোনো মতবিনিময় হয়েছে এই ছবি সংযোজন নিয়ে? ডাকসু কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নয়, এটা সকল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের৷

এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সকলের সাথে মতবিনিময় করাই কি সংগত ছিল না? তা না করে কেন জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়ে একটা বিতর্ক সৃষ্টি করা হল? এই বিতর্কে লাভটা কার হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে বহির্বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের ছবি সংযোজন নিয়ে রাষ্ট্রনায়কদের মতামত অনুধাবন যোগ্য৷ কী বলছেন তারা?

প্রত্যেককে নিজের অফিসে নিজের সন্তানদের ছবি ঝোলানোর আহ্বান করেছেন ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি।

গত ২৭ মে তারিখে দেয়া তার উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, আপনাদের অফিসে আমি আমার ছবি ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে চাই না। প্রেসিডেন্ট কোনো প্রতিমা বা আইকন নয়। বরং, অফিসে নিজের সন্তানদের ছবি ঝোলান আর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবার সময় সেদিকে তাকান।

জেলেনস্কি বলেন, আমরা দেশকে সব সম্ভাবনা দিয়ে গড়বো যেখানে আইনের চোখে সবাই হবে সমান এবং শাসনকাজ চলবে সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। আর তা বাস্তবায়ন করতে আমাদের প্রয়োজন জনগণের শাসন, যারা জনগণের জন্য কাজ করবে।

এর আগে নির্বাচনে বিজয়ের পর জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমি কখনো আপনাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করব না।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, নির্বাচনে দাঁড়াবার আগে জেলেনস্কির কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না এবং তিনি একবার টেলিভিশনে মজা করে প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন৷ তিনি অভিনেতা হতে নেতা হয়ে এসে যদি এমন কথা বলতে পারেন তবে নেতা হতে নেতা হতে থাকা আমাদের নেতা-নেত্রীরা কেন তা বলতে পারছেন না?

নেতা-নেত্রীদের ছবি ওয়ালে নয় জনগণের বুকে স্থাপিত হোক৷ জনবান্ধব আদর্শিক কর্মসূচীই পারে এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে৷ কিন্তু আমাদের দেশে চলছে অতি উৎসাহীদের নেতা তোষণ ও আশ্চর্যজনক ভাবে নেতাদেরও তা উপভোগ৷ অতি উৎসাহী তোষণবাজদের খপ্পরে পড়ে তারা জনগণের বুক হতে সরে যাচ্ছেন৷ রাষ্ট্রপতি,মন্ত্রী,এমপি মানেই বাড়িগাড়ি,ব্যাংক ব্যালেন্স ও ক্ষমতার বাহাদুরী৷ তাই নয় কি?

উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকার সম্পদ বলতে ছিল একটি পুরাতন ভক্সওয়াগন গাড়ি, আর কৃষিকাজের জন্য একটি ট্রাক্টর। আর তিনি চলাচল করতেন বাইসাইকেলে৷

তার ভক্সওয়াগন গাড়িটি মধ্যপ্রাচ্যের এক আমির ১০ লক্ষ ডলার দাম দিয়ে কিনে নিতে চেয়েছিলেন। মুজিকা হাসিমুখে তা নিষেধ করেছেন। বলেছেন বাজারে গাড়িটির দাম ১ হাজার ডলারও না৷ তিনিই ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট। তার মাসিক বেতন প্রায় ১২ হাজার ডলার। এর মধ্যে, তিনি তার নিজের জন্য মাত্র ৭৫০ ডলার রেখে বাকিটা দান করে দিতেন।

তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়েও নিয়মিত কৃষিকাজ করতেন। তার সবচেয়ে দামি সম্পদ ছিল ১৯৮৭ সালে কেনা ১ হাজার ৯০০ ডলারের গাড়িটিই। তার নামে ছিল না কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স৷ এমন মানুষের ছবি ইটপাথরের কোন ওয়ালে থাকার কোন প্রয়োজন আছে কি? জনগণের বুকের ওয়াল কি এ ছবি সরাবে কোনদিন? আমাদের দেশে এমন নজীর হবে কি কোনদিন?

ভোগবিলাস,তোয়াজ তোষণ ও অগণতান্ত্রিক ক্ষমতার দাম্ভিকতা পরিহার করে আমাদের নেতা-নেত্রীরা আসবে কি গণতান্ত্রিক আদর্শের পথে? নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, আমি সাদাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি এবং আমি কালোদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। আমি আদর্শিক গণতন্ত্র এবং মুক্ত সমাজের প্রশংসা করি, যেখানে সকল ব্যক্তি শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে এবং সমান সুযোগ লাভ করবে।

এটি হচ্ছে একটি আদর্শিক অবস্থান, যার মধ্যে দিয়ে বাঁচা দরকার এবং আমি তা অর্জনের আশা করি, কিন্তু এটি এমন এক আদর্শ, যদি প্রয়োজন পড়ে, তার জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত। বাংলাদেশে ভোগবিলাস ও দাম্ভিকতা পরিহার করে আদর্শিক গণতন্ত্রের চর্চা করে কি কেউ? ক্ষমতার স্পর্শে তারা ভুলে যায় নৈতিকতা ও মানবিকবোধ? সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে তবে কি আদর্শিক নেতার আকাল পড়ল দেশে? নইলে কেন তোয়াজ তোষামোদ লুফে নিতে মুখিয়ে থাকে তারা?

এ বিষয়ে প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক মহাবীর আলেকজান্ডারের শেষ অভিপ্রায়ের বিষয়বস্তুটা যদি আজকের ক্ষমতাধররা একটু ভাবতেন এতে হয়তো তাদের ক্ষমতা সম্ভোগ কিছুটা নাড়া পেতো৷

মৃত্যু শয্যায় মহাবীর আলেকজান্ডার তার সেনাপতিদের ডেকে বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর আমার তিনটা ইচ্ছা তোমরা পূরণ করবে, আমার প্রথম অভিপ্রায় হচ্ছে, শুধু আমার চিকিৎসকরাই আমার কফিন বহন করবেন,আমার দ্বিতীয় অভিপ্রায় হচ্ছে, আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্থানে যাবে সেই পথে আমার অর্জিত সোনা ও রুপা ছড়িয়ে থাকবে,আর শেষ অভিপ্রায় হচ্ছে, কফিন বহনের সময় আমার দুইহাত কফিনের বাইরে ঝুলে থাকবে৷ তখন মহাবীর আলেকজান্ডারের সেনাপতি তাঁর এই বিচিত্র অভিপ্রায়ের কারণ জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি দুনিয়ার সামনে তিনটি শিক্ষা রেখে যেতে চাই প্রথমত, আমার চিকিৎসকদের কফিন বহন করতে এই কারণে বলেছি যে, যাতে লোকে অনুধাবন করতে পারে যে চিকিৎসকেরা কোন মানুষকে মৃত্যুর থাবা থেকে রক্ষা করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, গোরস্থানের পথে সোনা-দানা ছড়িয়ে রাখতে এই কারণে বলেছি যে, সোনা-দানার একটা কণাও আমার সঙ্গে যাবে না৷ এগুলো পাওয়ার জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করেছি কিন্তু নিজের সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না।

তৃতীয়ত, কফিনের বাইরে আমার হাত ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা জানাতে যে, খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি৷ যারা ক্ষমতার স্পর্শে মদমত্ত হয়ে কেবলই ভোগ বিলাস, ব্যাংক ব্যালেন্স,তোয়াজ তোষণে আসক্ত হয়ে উঠছেন তারা মহাক্ষমতাধর আলেকজান্ডারের শেষ ইচ্ছা থেকে এই তিন শিক্ষা গ্রহণ করবেন কি? আদর্শিক, প্রচারবিমুখ,তোষণবিমুখ ও ভোগবিমুখ জনবান্ধব নেতাই জনতার প্রত্যাশিত৷মানুষের প্রত্যাশা আদর্শিক নেতার আকাল দূর হোক৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)