চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্মৃতি-বিস্মৃতির আজিমপুর কলোনি

এক
‘‘মানুষ আসলে বড় হয় না
বড়’র মতো দেখায়।’’

সম্ভবত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন। আমি খুব মানি এই কথাটা। কারণ আমাদের চারপাশের বেশীরভাগ মানুষজনই এরকম মানে হয় তাহারা বড়’র ভান করে কিংবা তাহাদেরকে বড়’র মতো দেখায়।আসলেই কি তাহারা বড়! আমার মনে হয় এসব বড়’র ভাব দেখানো মানুষগুলো কোন অর্থেই বড় নন-তাহারা তৃণলতার চেয়েও ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।

বিজ্ঞাপন

তারপরও সব সময় এই চিত্র এক নয়। জগতসংসারে কিছু কিছু মানুষ আছেন তারা নিজেদের কাজকর্ম, ব্যবহার, বিনয় আর উদারতা দিয়ে নিজেদের চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন। আমি আমার এ লান্নত বহুল জীবনে না চাইতেই এরকম অনেক মানুষের সন্ধান পেয়েছি।

সাম্প্রতিক সময়ে পেয়েছি ভালোবাসার আজিমপুর কলোনি’র মাধ্যমে দুজন মানুষ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এদের একজন হলেন রতন ভাই। আজিমপুর কলোনির বড় ভাই। রতন ভাই আমার বড় মামা খুরশিদ আহমেদ অপু’র বন্ধু। ৭৫-৭৬ সালে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সুইডেন। সেই থেকে সেখানে। ৬৪ বছর বয়স অথচ প্রাণ প্রাচুর্যে এখনো কত সজীব! কত প্রাণবন্ত! রতন ভাইকে দেখলে মনে হয় তাঁর বয়স বুঝি এখনো ‘বায়ো কি তেয়ো’। তার মধ্যে এখনো ‘পোলাপাইনি’ স্বভাব রয়ে গেছে। সদাহাস্য, সজ্জন আর তারুণ্যে ভরপুর এই মানুষটা আমাকে দারুণভাবে উদ্দীপিত করেছে।

অল্পতেই মোহ ভঙ্গ হবে এই ভয়ে আমি খুব একটা মানুষের ভক্ত হই না। মিছে কষ্ট কিনে লাভ কি! কিন্তু এই রতন ভাই আমাকে নিঃশর্ত ভাবে আকর্ষিত করেছেন।

দুই
আরেকজনের নাম মাসুম বারি মানে আমাদের মাসুম ভাই। মাসুম ভাইকে চিনি ১৯৮১ সাল থেকে। তাকে যখন প্রথম দেখি মনে হয়েছিল তিনি বুঝি তালপাতার সেপাই। চিকন চাকন লম্বা চওড়া গড়নের মাসুম ভাই খুব ভাল ফুটবল খেলতেন। মাথায় ঝাঁকড়ামাকড়া চুল। এই মাসুম ভাই আবার আমার মেঝ দাদা হিমু ভাইয়ের বন্ধু। তারা একসঙ্গে ‘৮৪ সালে সুইডেনে চলে গিয়েছিলেন। তখন দেশে থেকে দলে দলে তরুণদের মধ্যে জার্মান সুইডেন যাওয়ার বাতিক ছিল। আমার ভাই আর মাসুম ভাই সেপ্টেম্বরের এক রাতে রাশিয়ার বিমান অ্যারোফ্লটে চড়ে মস্কো নেমে শীতের দেশ সুইডেনে চলে গিয়েছিলেন। তারপর আর দেখা হয়নি মাসুম ভাইয়ের সঙ্গে। এরপর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ১৯৯১ সালে সুইডেনে, আমি সে বছর গিয়েছিলাম সুইডেনে। আমার রাজনৈতিক আশ্রয়ের কেস টেকে নি। ফলে আমাকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। সে অনেক কথা।

বিজ্ঞাপন

তিন
আমার শৈশবের কিছুকাল কেটেছে আজিমপুর কলোনিতে, আমার নানা বাড়ি ২/বি-তে। যারা আজিমপুর কলোনিতে থেকেছেন তাদের বুকের ভেতর সব সময় তড়পায় আজিমপুর কলোনির জন্য তুলে রাখা প্রেম-ভালোবাসা-মহব্বত। আজিমপুর কলোনি- এ এক নিঃশর্ত ভালোবাসার নাম।

‘ভালোবাসার আজিমপুর কলোনি’ নামে একটা পেজ খোলা হয়েছে দেখে প্রথমে আমি খুবই আদ্র হয়ে পড়েছিলাম- ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু না, বেশিদিন সেই ভালোবাসাটা থাকল না। সেই কাহিনি আর না-ই বলি। বয়স হয়েছে এখন আর নিন্দা- গীবত ভালো লাগে না। যেখানে প্রাণের স্পন্দন পাই সেখানে যেতে মন চায়।

চার
৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায়, আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় সুইডেন থেকে আসা রতন ভাই, মাসুম ভাই, রেনি সানি সহ অনেকে মিলে আজিমপুর কলোনির বাসিন্দাদের নিয়ে একটা ছোট্ট মত প্রাণের মেলার আয়োজন করেছিলেন। রতন ভাই ছিলেন সঞ্চালনার দায়িত্বে। প্রাণবন্ত এক আয়োজনে সেদিন আমি আজিমপুরের অনেক পুরনো প্রিয় মুখের সম্মিলন দেখেছি। অনুষ্ঠানে আজিমপুর কলোনি নিয়ে একে একে অনেকে প্রাণ খুলে বলেছেন নিজেদের মনের কথা। স্মৃতি রোমন্থন, প্রেম অপ্রেমের কত স্মৃতি সেদিন উচ্চারিত হয়েছে।আমি সেদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র রতন ভাই আর মাসুম ভাইয়ের গভীর আন্তরিকতার ডাকে। অনুষ্ঠানের আগের দিন মাসুম ভাই বললেন, তোমারে আইতেই হইব। এরকম ভালোবাসায় মাখামাখি ডাকে সাড়া না দিয়ে পারি!

আমি আরও একটা কারণে সেদিনকার রতন ভাই, মাসুম ভাইদের ডাকা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ‘৮৪ সাল থেকে আমার মেঝ দাদার সঙ্গে রতন ভাই, মাসুম ভাইরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছেন। আমার মেঝদাদা অনেকদিন ধরে আসেন না। তাই তাকে দেখাও হয় না। আজিমপুরে যাওয়ার পর রতন ভাই আর মাসুম ভাই যখন আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন তখন আমার মনে হল আমার মেঝ দাদা যেন আমাকে পরম ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছেন।

রতন ভাই আর মাসুম ভাইয়ের উষ্ণ সান্নিধ্যে সেদিন আমি আমার সুইডেনে থাকা মেঝদাদার ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি।