চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি মহামূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ, মামলাটি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছে। মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসাতে চেয়েছিল। বাঙালির আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে ফজিলাতুন্নেছাকে পারিবারিক টানাপোড়েন সহ অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খরচ চালানো সহ মামলার সার্বিক তদারকি তথা পুরো দায়দায়িত্ব এসে পড়ে ফজিলাতুন্নেছার উপর। তখন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী দেশব্যাপী নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে ছিলেন।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আমেনা বেগম মামলা পরিচালনার কাজে গড়িমসি করেন। কিন্তু ত্যাগী এবং দেশপ্রেমিক ফজিলাতুন্নেছাকে জীবনের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করে মামলার খরচ বহন করতে হয়। ঐ সময়টায় ফজিলাতুন্নেছার সংসারে অর্থ সংকট ছিল। দিনের পর দিন শেখ মুজিবকে কারাগারে থাকতে হয়েছে, এদিকে সব দেখভাল করতে হয়েছে ফজিলাতুন্নেছাকে। স্বামীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা এবং পরম ভক্তি ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে কোনকিছু থেকেই বিরত রাখতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান কৌশলী সালাম সাহেবকে প্রদেয় টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি কোর্টে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এহেন কঠিন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় পরে যান বেগম মুজিব। ছাত্রলীগের ছেলেরা মামলার খরচ বহন করার জন্য কুপন ছাপায়। ফজিলাতুন্নেছার ছোট ভাই শেখ আকরাম হোসেন ও বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মমিনুল হক খোকার মাধ্যমে গোপনে টাকা পয়সা সংগ্রহ করে সালাম সাহেবের বকেয়া পরিশোধ করেন এবং তিনি পুনরায় কোর্টে নিয়মিত হন। এই ছিল তখনকার সময়ের দুঃসহ পরিস্থিতি। বাংলার মুক্তিকামী মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু কারাগারে অথচ টাকার অভাবে কোর্টে উকিল হাজির হয় না। বহমান স্রোতের বিপরীতে সবসময় স্থির থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনকে বেগবান করার চেষ্টা করেছিলেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শেখ মুজিবকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় পরিবারকে কোন তথ্য না দিয়েই। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন বা মরে গেছেন এ বিষয়টি দলীয় নেতাকর্মী, পরিবার এবং দেশের জনগণের কাছে অস্পষ্ট ছিল। তখন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন তার স্বামীর অনুসন্ধানে, সম্ভাব্য স্থানসমূহে তথ্য অনুসন্ধান করেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এদিকে, আগরতলা মামলা দায়ের করার পর তৎকালীন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ফজিলাতুন্নেছা’কে জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়। পাকিস্তানের নেতারা বিভিন্ন সময়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে দেখা করতে আসতেন, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলতেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের সময়েও তিনি দৃঢ়তার সহিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথাই বলেছেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলার মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের জন্য গোপন কোন কিছুর সাথে তিনি কখনোই আপোষ করেননি। পাকিস্তানের কূটনৈতিক চালে এবং সামরিক সরকারের মদদে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জোরালো আপত্তি জানান এবং প্রতিহত করেন। যেদিন প্যারোলে মুক্তির প্রতীক্ষায় আওয়ামী লীগের নেতারা জেলগেটের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেদিনই বিষয়টি অবগত হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডেকে পাঠান বঙ্গমাতা এবং চিঠি সম্বলিত শেখ মুজিবের কাছে পাঠান। এ কাজে মরহুম ওয়াজেদ মিয়াও সহযোগিতা করেন।

জেলগেটে শেখ হাসিনাকে দেখে উপস্থিত নেতারা অনেকেই বলেছিলেন- এ কেমন মেয়ে, বাবার মুক্তি চায় না। ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও তৎকালীন নেতারা বলেছিলেন- ভাবী আপনি তো বিধবা হবেন। প্রতিউত্তরে তিনি বলেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই বিবাহিত, আমি তো একা না, মামলা প্রমাণিত হলে ৩৪ জন বিধবা হবে। আমার একার চিন্তা করলে হবে না। মামলা উইথড্র না করলে উনি লাহোরের সম্মেলনে যাবেন না। ঐ দিন বিকেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার অনুমতি পান ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সাক্ষাতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন- “আজ তুমি যদি প্যারোলে যেতে রাজি হতে তাহলে তোমার বিরুদ্ধে আমি পল্টনে জনসভা করতাম।” পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। অর্থাৎ ফজিলাতুন্নেছার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ফলপ্রসু হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। শেখ মুজিবকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। পরে অবশ্য প্রমাণিত হয়েছিল সেদিন প্যারোলে মুক্তি নিলে কী হত! ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা যে রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর ছিল তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে আজ প্রতিষ্ঠিত ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। কেননা এই মহীয়সী নারী দেশের সার্বিক আন্দোলনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাকালীন সময়গুলোতে বঙ্গমাতার সাথে বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা যোগাযোগ রাখতেন এবং দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্বন্ধে তথ্য উপাত্ত দিতেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রাক্কালে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করে সকল বিষয়ে অবহিত করেন এবং ফজিলাতুন্নেছার ইচ্ছের কথা সবিস্তারে তুলে ধরেন। বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ, তাই বেগম মুজিবের দৃঢ় বিশ্বাস আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে খ্যাত মামলা প্রত্যাহার করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু যেন শক্ত, দৃঢ় ও সিদ্ধান্তে অটুট থাকেন সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন ও অনুরোধ জ্ঞাপন করেন।

ফজিলাতুন নেছার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বেগবান হয়। প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিঃশর্তে মুক্ত হলেন ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালিরা তাদের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি, তুখোড় ছাত্রনেতা, বর্তমান এমপি ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের তত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয় লাখো জনতা তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। এ এক মহান সম্মিলন ছিল যেখানে গ্রাম বাংলার মেঠো পথ থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের রাজপথে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির জন্য আন্দোলনরত ছাত্র-সমাজসহ আপামর জনসাধারণ উপস্থিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা প্রদান করেন।

তৎকালীন সিএসপি কর্মকর্তা মরহুম রহুল কদ্দুস আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন। তার ছেলে জনাব ইহসানুল আমিন ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক Independent এ প্রকাশিত স্মৃতিচারণায় ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সম্বন্ধে উল্লেখ করেন “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে এক পর্যায়ে এই মর্মে খবর ছড়ায় যে, তখনকার প্রবল গণআন্দোলনের মুখে সংলাপের জন্য আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারেন। এই খবরে বঙ্গবন্ধুর সাথে সহ-অভিযুক্তদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এদের মধ্যে আমাদের পরিবারও অন্যতম। এককভাবে বঙ্গবন্ধুর সম্ভাব্য মুক্তি প্রাপ্তির সংবাদে বন্দী পিতার নিরাপত্তার জন্য স্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন আমি ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সাথে যোগাযোগ করি। ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সেদিন এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেলে অভিযুক্ত সবাইকে নিয়েই মুক্তি পাবেন। অন্যদের জেলে আটকে রেখে তিনি কিছুতেই বেরিয়ে আসবেন না।” ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথায় সেদিন সকলেই আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবের মুক্তির সিদ্ধান্তের বিষয়েও তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। স্বার্থপরতা, নিষ্ঠাহীনতা, অসততার লেশমাত্র ছিল না ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের চরিত্রে। তিনি কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্বতার স্বরূপের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বাকি ৩৪ জনদের রেখে কখনোই নিজের স্বামীর কথা চিন্তা করেন নাই, এই কারণেই তিনি অনন্য-অদ্বিতীয়। শুধু কি তাই, অন্য আসামীদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা প্রদানে তিনি ছিলেন সমান আন্তরিক ও সচেষ্ট। এই মামলা চলাকালীন তিনি অন্য আসামীদের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, সুখ-দুঃখের সমান অংশীদার হতেন। মামলা পরিচালনা করার স্বার্থে আহুত সমস্যাগুলিকে নিজেই সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীনতা, উদারতা এবং সময়পোযোগী কার্যক্রমের ফলস্বরূপ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবসহ অন্যান্য আসামীরা বেকসুর খালাস পায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ বাকি আসামীদের একসাথে বেকসুর খালাস দেওয়া হয় বা দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার, জনগণের আন্দোলনের মুখে। মহীয়সী নারীর প্রতি আজকের দিনে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View