চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আইফোন দিয়ে হয়তো শুটিং করতেন না, তবে ওটিটি পছন্দ করতেন সত্যজিৎ: সন্দীপ রায়

‘অপুর সংসার’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’, ‘সোনার কেল্লা’ -এমন অনেক চলচ্চিত্র সত্যজিৎ রায়কে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের। বিশ্ববন্দিত এই বাঙালি চলচ্চিত্রকারের জন্মশতবার্ষিকী আজ। ১৯২১ সালে ২ মে কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

প্রতি বছর ২ মে বিশপ লেফ্রয় রোডের বিরাট হলুদ রঙের ম্যানসনটির গোটা তিনতলা জুড়ে সারা দিনব্যাপী থাকে ভক্তদের আনাগোনা। রাজ্য ও শহরের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন প্রয়াত এই শিল্পীর উদ্দেশে। তবে বর্তমানে করোনার কারণে এবার বন্ধ রাখা হচ্ছে রায় বাড়ির দরজা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায়ের ছেলে নির্মাতা সন্দীপ রায় জানিয়েছেন, প্রথমে পরিকল্পনা ছিল সত্যজিৎ রায়ের সম্মানে যারা ফুল নিয়ে আসেন, তাদের উপহার গ্রহণ করার। তবে করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনাও বাদ দেয়া হয়েছে। তার মতে, শ্রদ্ধা-ভালবাসা তো হৃদয়েই থাকে, সশরীরে উপস্থিত থাকার চেয়েও বড় বিষয় সেটি।

যদিও সত্যজিৎ রায় তার রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত না, তবুও অনেকেই ভাবছেন যে তিনি যদি আজ থাকতেন, তবে এই ডিজিটাল পৃথিবীর পলিটিকাল পোলারাইজেশন দেখে কী করতেন। সন্দীপ রায়ের মতে, সত্যজিৎ রায় হয়তো ‘হীরক রাজার দেশে: পার্ট টু’ নির্মাণ করতেন। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে চমকে দিতেন দর্শকদের। ‘আইফোন দিয়ে হয়তো শুটিং করতেন না, তবে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম পছন্দ করতেন’, বললেন সন্দীপ।

সত্যজিৎ রায়ের শুভাকাঙ্ক্ষীরা নানা ভাবে তাদের প্রিয় নির্মাতার জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, খুবই ভালো লাগছে সন্দীপের। তবে তিনি সাদাকালো ছবিগুলোকে রঙিন করে তোলার বিপক্ষে। বেশ কিছু বায়োপিক এবং ‘পথের পাচালী’ সিনেমাটি নতুন করে নির্মাণের কাজ চলছে। এই প্রসঙ্গে সন্দীপ বলেন, ‘আমরা তার নাম ব্যবহার করে বায়োপিক তৈরির অনুমতি দেইনি। বাবার চরিত্রে কে অভিনয় করবেন?’

নতুন অভিনেতাদের অনেকেই সত্যজিৎ রায়ের ছবির বিভিন্ন দৃশ্য নতুন করে তৈরি করছেন। এই বিষয়টির পক্ষেও নন সন্দীপ। তিনি বলেন, ‘এই পুনর্নির্মাণগুলোর আসল প্রযোজকের অনুমতি নেয়া প্রয়োজন। এইধরনের ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ করা খুবই বিরক্তিকর এবং বিপদজনক।’

বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছেলে সন্দীপ রায়। 

লকডাউনের সময় ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার সময় সত্যজিৎ রায়ের তিনটি ডায়রি পাওয়া গেছে। ডায়রিগুলো ১৯৩৫, ১৯৩৬ এবং ১৯৩৯-এর। আকিরা কুরোসাওয়ার দেয়া একটি ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা কার্ডও পাওয়া গেছে। ডায়রির লেখাগুলো বেশ মজার। “৩১ ডিসেম্বরের পর শেষের দুই মাতা থাকতো হলিউড সিনেমার রিভিউ লেখার জন্য। তিনি ‘স্টার রেটিং’ দিতেন। ‘অ্যানা কারেনিনা’ পেয়েছিল চারটি স্টার। অর্থাৎ ‘অসাধারণ’। ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ পেয়েছিল দুটি স্টার, অর্থাৎ ‘ভালো'”, বললেন সন্দীপ।

বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন সত্যজিৎ রায়? প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “তিনি ছিলেন পুরপুরি ‘ফ্যামিলি ম্যান।’ সময় খুব ভালো করে কাজে লাগাতে পারতেন তিনি। মাঝে মাঝে মতে হতো, কেউ ভুল করলে তার রাগ করা উচিত ছিল। রাগ নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। এই বিষয়টি শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বোসের অধীনে ট্রেনিং-এর সময় শিখেছিলেন তিনি।”

তবে, কান চলচ্চিত্র উৎসবে যখন ‘অপরাজিত’র পর ‘অপুর সংসার’ও প্রত্যাখ্যাত হল, তখন বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন সত্যজিৎ। তবে হতাশ না হয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি।

সত্যজিৎ রায়ের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ‘দ্য এলিয়েন’। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীনির্ভর এই ছবিটি হলিউডে নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পিটার সেলার্স ও মার্লোন ব্রান্ডোদের ছবিটির প্রধান অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার ক্লার্কের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের এই ছবির চিত্রনাট্যের বিষয় নিয়ে চিঠিপত্র আদানপ্রদান হয়েছিল। কিন্তু চিত্রনাট্য লেখা শেষ করার পর সত্যজিৎ জানতে পারেন যে সেটির স্বত্ব তার নয় ও এর জন্য তিনি কোন সম্মানও পাবেন না। পরবর্তীকালে মার্লোন ব্র্যান্ডো জানান তিনি অভিনয় করতে পারবেন না। তার জায়গায় জেমস কোবার্নকে আনার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ততদিনে সত্যজিৎ হতাশ হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর ১৯৮২ সালে যখন স্টিভেন স্পিলবার্গের ই.টি. (দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল) মুক্তি পায়, তখন ছবিটি দেখার পর দেড় দশক আগে সত্যজিতের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান অনেকেই। যদিও স্পিলবার্গ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

অনেকেই মনে করেন এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করার করার জন্যই ১৯৯২ সালে সত্যজিৎ রায়কে দেয়া সম্মানসূচক অস্কার দেয়া হয়।