চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আইন, বিচারক, শাসকদলের ভূমিকা ও পিরোজপুরের দৃষ্টান্ত

আমাদের দেশে আইন-আদালত-বিচার এসব নিয়ে কোনো রকম আলোচনা বা মন্তব্য করাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি জটিল এবং স্পর্শকাতর। সুলেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত নিজে বিচারক ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ছোট আদালত মানে হচ্ছে ছোটা এবং ছোটা। ছুটতে ছুটতে কালো ঘাম বেরিয়ে যাবে। তা সেই ছোট আদালতের পরে সেজ, মেজ কতো আদালত, বড় আদালতে পৌঁছে মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে একটা জীবন বরবাদ হয়ে যায়। মামলার ঘাড়ে মামলা, আপিলের পিঠে আপিল। একবার এ-পক্ষ জেতে, ও-পক্ষ জেতে আরেকবার। ততোদিন সর্বনাশ হয়ে যায়। হয় অর্থনাশ, কর্মনাশ, ধর্মনাশ। এসব কথা অবশ্য আমরা সবাই জানি। আমরা আরো জানি যে, মামলা করে কোনো লাভ হয় না। উত্তেজনা বাড়ে, রক্তচাপ বাড়ে, রক্তে শর্করা বাড়ে, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়। অন্যদিকে টাকা-পয়সা, ধনদৌলত, বাড়ি-জমি সব যায় মামলার গহ্বরে। গ্রামে-গঞ্জে এখনো কেউ কারো ওপরে ক্রুদ্ধ হলে অভিসম্পাত করেন- ‘তোর ঘরে যেন মামলা ঢোকে।’ ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন, এর চাইতে বড় অভিশাপ হয় না। তারপরও অবশ্য মামলা থেমে নেই। রাস্তাঘাটে যানজট, শিক্ষাকেন্দ্রে সেশনজটের চাইতে আদালতে মামলাজট এখনো অনেক বেশি!

সম্প্রতি একটি দুর্নীতি মামলায় একজন বিচারকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাকে প্রত্যাহার করা এবং নতুন বিচারক নিয়োগ করে বিপরীত রায় বের করে আনার ঘটনা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া হস্তক্ষেপের বিষয়টি নতুন করে সমালোচিত হচ্ছে। ঘটনাটি খুলেই বলা যাক। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়াল এবং তার স্ত্রী পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লায়লা পারভীনের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পৃথকভাবে তিনটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন। সেই মামলায় উচ্চ আদালতের ৮ সপ্তাহের জামিন শেষে পিরোজপুর জেলা জজ আদালতে হাজির হন তারা। পুনরায় করেন জামিন আবেদন।

বিজ্ঞাপন

এ সময় বিচারক মো. আব্দুল মান্নান জামিন না মঞ্জুর করে তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ রায় ঘোষণার পর আদালত পাড়াসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। লাঠিচার্জ করে উত্তেজিত নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। জামিন নাকচের পরপরই স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নানকে। এর পাঁচ ঘণ্টা পর ভারপ্রাপ্ত জেলা জজের দায়িত্ব দেয়া হয় নাহিদ নাসরিনকে। সঙ্গে সঙ্গেই আউয়াল দম্পতিকে জামিন দেন তিনি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম আবদুল আউয়াল ও তার স্ত্রীর জামিন চাওয়াকে কেন্দ্র করে আবদুল আউয়ালের আইনজীবী এবং বারের আইনজীবীদের সঙ্গে জেলা জজ অত্যন্ত অশালীন ও রূঢ় ব্যবহার করেন। এর ফলে বারের আইনজীবীরা আদালত বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে যায়। সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিচারককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একটি দুর্নীতি মামলার বিচার করতে গিয়ে একজন জেলা জজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন, তা নজিরবিহীন। ক্ষমতাসীনরা যে আইন, বিচার, এমনকি বিচারকদেরও প্রভাবিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, পিরোজপুরের ঘটনাটি তারই একটি নজির হয়ে রইল।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা জজ ‘অত্যন্ত অশালীন ও রুঢ়’ ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সেই ‘অশালীন ও রূঢ়’ আচরণটি কেমন? তিনি বকাঝকা করেছেন? আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন? নাকি ক্ষমতাসীনদের কথা শোনেননি? জেলা জজ যে ‘অত্যন্ত অশালীন ও রুঢ়’ আচরণ করেছেন, সেটি কি কোনো তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে? কোনো তদন্ত কমিটি কি গঠন করা হয়েছে? তা যদি না হয়, তাহলে কিসের ভিত্তিতে, কার কথা শুনে জেলা জজকে প্রত্যাহার করলেন? এই কি আইনের শাসনের নমুনা? এটাই কি বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্ব? সবচেয়ে মূল্যবান প্রশ্ন হচ্ছে- ‘অশালীন এবং রুঢ়’ আচরণের জন্য না হয় তাৎক্ষণিক ওই বিচারককে প্রত্যাহার করে নিলেন, কিন্তু মাত্র চার ঘণ্টার ব্যবধানে রায় পুরোপুরি উল্টে গেলো কীভাবে? এই ব্যাপারে মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য কী? এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কি বিচার ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করা হলো না?

এমনিতেই আমাদের দেশে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস খুব একটা দৃঢ় নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থাসহ সব কিছুর অবাধ দলীয়করণ হয়েছে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলগুলো আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছে। ক্ষমতাসীনরা আইন বিচার সব কিছুকেই ‘একান্ত আপন‘ করে নিয়ে নিয়েছেন। আইন, বিচার, বিচারক সব কিছুরই তারা চালকে পরিণত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে’-এই আপ্ত বাক্যের কোনো ভিত্তি আমাদের দেশে অন্তত বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যায় না। আসলে আইন কখনোই তার নিজস্ব গতিতে চলে না। কারণ আইন নিজে ‘চলতে’ পারে না। আইনকে ‘চালাতে’ হয়। আইনকে ‘চালান’ একদল ক্ষমতাবান মানুষ। এই মানুষরা আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিচালিত হন যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের দ্বারা। ফলে আমাদের দেশের আইন ‘নিজে চলার’ চাইতে ‘চালানোর’ ওপরই নির্ভরশীল বেশি।

যে নিজে ‘চলতে’ পারে না, যাকে ‘চালাতে’ হয়, সে ‘কর্তার’ ইচ্ছেয় ‘কর্ম’ করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর কর্তার ‘ইচ্ছে’কে যে পরিবর্তন করা সম্ভব একথা কে না জানে? ‘তুষ্ট’ করতে পারলে ঈশ্বরও ভক্তের অনুকূলেই ‘রায়’ দেন। কাজেই আইন নিজ গতিতে আপন নিয়মে সুষ্ঠুভাবে কখনোই চলে না। বাংলাদেশের মতো ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও লোভের ‘দেবতার দেশে’ তো নয়ই। কবির ভাষায়- এখানে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। এখানে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাবই শুধু দেখা যায় না, একই আইনের প্রয়োগ একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হতেও দেখা যায়। কখনো বা সম্পূর্ণ বিপরীত। এর কারণও অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রতীচ্য ধারণা অনুযায়ী আইনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী অন্ধ। তার চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা। যদিও তার হাতে তুলাদণ্ড রয়েছে, কিন্তু দেবীর চোখ বাঁধা বলে নিজের অসমতা অনেক সময় দেখতে পারেন না!

বিচারক

আমাদের দেশে ‘আইনের দেবী’কে ‘অন্ধ’ করে রাখা হয়েছে। আর এই ‘অন্ধ দেবী’কেই আমরা যুগ যুগ ধরে অন্ধভাবে পূজা করে এসেছি। কিন্তু এই ‘দেবী’র বিচার বা বিবেচনার প্রসাদ পেয়ে সবাই সমানভাবে তুষ্ট হতে পারিনি। ইদানিং এ ‘দেবী’ সম্পর্কে ‘পক্ষপাত’ ও ‘দলবাজি’র অভিযোগও জোরে-শোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। মনে মনে তাই অনেকেই এই ‘দেবী’র প্রতি বিরূপ। কিন্তু ‘দেবী’র ‘কোপানলে’ পড়ার ভয়ে তা কেউ প্রকাশও করতে পারেন না। ‘দেবীর’ অবশ্য এটা বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই। তার মানে, আইনের ‘অন্ধ দেবী’র সঙ্গে আমাদের একটা দূরত্ব কিন্তু রয়েছেই।

দেবীর চোখের ‘কালো কাপড়টা’ না খোলা পর্যন্ত আসলে এ বিরোধ মিমাংসার কোনো সহজ পথ নেই। আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, দেবী ‘অন্ধভাবে’ নয়, বরং ‘চোখ মেলে’ সব দেখুক। কালো পর্দা সরে যাক, দেবী দেখবার স্বাধীনতা অর্জন করুক। দেখে-শুনে-বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। আমরাও দেবীর চোখ দুটিকে দেখি। প্রয়োজনে চোখে চোখ রেখে কথা বলি!

রাজনীতির মঞ্চ, বিচারাঙ্গন থেকে শুরু করে সমাজের সবখানেই আসলে ঔচিত্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। কোন কাজটি করা উচিত, আর কোনটি নৈতিকতার গণ্ডিতে ঠেকে যায় বলেই করা অনুচিত, এই বোধটির স্থান আইনের ঊর্ধ্বে। বস্তুত, কোনও আইন আদৌ ব্যবহার্য কি না, তা স্থির করবার মাপকাঠি এই ঔচিত্যবোধ। এই ঔচিত্যবোধ যখন দলতন্ত্রের কাছে হারিয়ে যায় তখন ঘোর অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)