চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অসাম্প্রদায়িক সরকারে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রী!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এক হতদরিদ্র জেলের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ১৫টি মন্দির ও ৩০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হলো। তার জের ধরে হবিগঞ্জের মাধবপুরেও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা চালানো হলো। নাসির নগরের জেলে রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়ে যায়। সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে হ্যাক হওয়ার ঘটনা জানিয়েছে এবং হ্যাকাররা তার আইডিতে কাবা শরীফের উপর শিবের মূর্তি স্থাপন করে ছবি আপলোড দিয়েছে বলে আতঙ্কিত বোধ করার কথাও জানিয়েছে। এখন সে পুলিশের রিমান্ডে আছে।

অন্যদিকে পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার নিমাই চর ইউনিয়নে অবস্থিত মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষক জহুরুল ইসলাম বুলবুল দেবদেবীদের সম্পর্কে তার নিজের অশ্লীল বাসনার কথা বলেছেন। হিন্দু জেলে রসরাজ দাসের নামে ফেসবুক একাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্ট যদি ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে তাহলে এক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নীতির ফলে কি শুধু হিন্দুরা ইসলামের কোন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে পারবে না, মুসলমানরা হিন্দুদের যে কোনো বিষয় নিয়ে বলতে পারবে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মন্দিরে হামলা

কী বললেন অসাম্প্রদায়িক সরকারের মন্ত্রী ও সাংসদ ছায়েদুল হক। নাসিরনগরের ডাকবাংলোয় হিন্দু নেতাদের উদ্দেশ্য করে সরকারের মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী বলেন, মালাউনের বাচ্চারা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। আর এ ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করে অতিরঞ্জিত করছে সাংবাদিকরা, অথচ ঘটনা কিছুই না। পুলিশ সুপার কর্তৃক ওসি আব্দুল কাদেরকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার আদেশ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সে ভালো লোক। তাকে প্রত্যাহার করা যাবে না।

রামু, পাবনার সাঁথিয়া, নাসিরনগর, মাধবপুরই শেষ নয়। হামলা বাড়ছে। মন্ত্রীর বক্তব্যের পর পর ভোররাতে হিন্দু বাড়িতে আবারও অগ্নিসংযোগ করা হলো। নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও ও নেত্রকোনাতেও মন্দিরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে ঘটতে পারে আরও ভয়াবহ ঘটনা। অসাম্প্রদায়িক সরকারে সাম্প্রদায়িক ভূতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। না হয় সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী ছায়েদুল হকের মতো ব্যক্তি কী করে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সাংসদ ও মন্ত্রী হন?

সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টির অপতৎপরতা থেমে নেই। ধর্মানুভূতিতে আঘাতের ইস্যুতে দেশময় অশান্তি সৃষ্টির এক গভীর চক্র সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে এক পাহাড়ি যুব নেতার ছবি বলে ইন্দোনেশিয়ার এক যুবকের ছবি প্রকাশ করা হয়। সাগর হোসেন নামে এক ব্যক্তি আঁধারে দ্বীনের আলো নামের এক গ্রুপে এই ছবিটি আপলোড করে এতে লিখেছে, পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সেক্রেটারি সন্ত্রাসী কুনেন্টু চাকমা পবিত্র কোরআন শরীফে পা দিয়ে ছবি উঠিয়ে ফেসবুকে দিয়েছে।

উস্কানিমূলক এই পোস্টটা মুসলিম যুবক সাগর হোসেন কেন দিল পুলিশ কি তা বের করেছে? নাকি সে পার পেয়ে যাবে? নিরীহ জেলে রসরাজ দাস হিন্দু বলেই হয়তো ছবি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেও bbaria-3 রেহাই পেল না। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল। স্থানীয় চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পুলিশের উপস্থিতিতে আহলে সুন্নাত আল জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম সমাবেশ করে হিন্দুর মন্দির ও বাড়িঘর ভাঙ্গার ক্ষেত্র সৃষ্টি করল। অসাম্প্রদায়িক সরকারে যে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ঢুকে গেছে এটা মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী পরিস্কার করে দিলেন।

অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক অবক্ষয়ে সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা ও চিন্তার প্রসার ঘটছে সর্বত্র। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল দাবিদার আওয়ামী লীগেও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির কোনো শিক্ষা নেই। অজ্ঞতা, মূর্খতা, মানবিকতার অভাব ও সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার ফলেই এসব সাম্প্রদায়িক ভাবনা বিকাশ লাভ করছে। এছাড়াও রয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগে সাম্প্রদায়িকপন্থীদের অনুপ্রবেশ। ভেতরে সাম্প্রদায়িক চিন্তা লালন আর বাইরে অসাম্প্রদায়িক দল করা, এমন লোকের ভূমিকা ভয়াবহ হতে বাধ্য।

বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক দাবিদার দল আছে কিন্তু অসাম্প্রদায়িক নেতা, কর্মীবাহিনী নেই। তাই মুসলমানের চোখে হিন্দুর মন্দির ভাঙ্গা, হিন্দুর বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটকে ধর্মানুভূতিতে আঘাত মনে হয় না। তাই হিন্দু রসরাজরা গ্রেফতার হলেও হিন্দু দেবীদের নিয়ে চরম বাজে কথা বলেও জহুরুলরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)