চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপনে অসভ্যতা, বিজ্ঞাপনে অশ্লীলতা

বছর কয়েক আগে ইরানে যেদিন ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, তারপরের দিন আমাদের দেশের সংবাদপত্রে একটা সিমেন্টের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল––‘ভালো সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি বানান।’ হাজার হাজার মানুষের বাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে গেলো, আরেকজন এসে বললেন––আমাদের কোম্পানির সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি বানালে এরকমটি হতো না।

গত ২৬ জুলাই যেদিন টানা বর্ষণে প্রায় পুরো ঢাকা তলিয়ে গেলো, মানুষের দুর্ভোগ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় বসে থাকতে হলো––সেদিন এক ফোন কোম্পানি এসএমএস পাঠিয়ে বলেছে, ‘বৃষ্টির দিনে উপভোগ করুন বায়োস্কোপের সাথে, তাহসান অভিনীত নাটক সেই মেয়েটা। দেখতে ক্লিক করুন ……… (ডাটা চার্য প্রযোজ্য)।’

বিজ্ঞাপন

একইদিন পানি বিশুদ্ধকরণ মেশিনের একটি বিজ্ঞাপনও চোখে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে জলাবদ্ধ শহরের রাস্তায় রিকশা চলছে এবং সেখানে বলা হচ্ছে,  জলাবদ্ধতায় দূষিত পানি, পানিবাহিত রোগ ও জীবাণু থেকে পানি বিশুদ্ধ করার নিশ্চয়তা দেয় শুধুমাত্র অমুক।

মোবাইল ফোন কোম্পানি বিকশিত হবার পর থেকে আমাদের দেশে বিজ্ঞাপনশিল্পে যে একটা অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বক্তব্য আর জিঙ্গেল নির্ভর বিজ্ঞাপন থেকে বেরিয়ে মানুষের আবেগ অনুভূতি কাজে লাগিয়ে গল্পনির্ভর বিজ্ঞাপন দেশের বিজ্ঞাপনের ধারণায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে এই ট্রেন্ড আরও আগেই চালু হয়েছে। দেরিতে হলেও আমাদের বিজ্ঞাপনের আইডিয়ায় ইনোভেশন আর শিল্পের ছোঁয়া যে লেগেছে, সে বিষয়ে আশা করি সবাই একমত হবেন।

কিন্তু বিজ্ঞাপনের নীতি-নৈতিকতা বলে একটা কথা আছে। আপনি পণ্যবিক্রির কৌশলের নামে যা খুশি তাই বলতে বা লিখতে পারেন না। কোন সময়ে কোন কথাটি বলা বা লেখা যাবে, তারও একটা এথিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড বা নৈতিক মানদণ্ড আছে। কোমরসমান ময়লাপানি ঠেলে যে লোক অফিসে যাচ্ছে, তাকে আপনি এসএমএস দিয়ে বলবেন, বৃষ্টির দিনে উপভোগ করুন তাহসানের এই গান বা নাটক––এটা পরিষ্কার তামাশা। এসব তামাশার বিরুদ্ধে আমাদের খুব সোচ্চার কণ্ঠে কথা বলা দরকার।

বিজ্ঞাপন

শুধু এই জলদুর্ভোগের দিনের এই তামাশামূলক এসএমএস নয়––মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো দিনরাত অব্যাহতভাবে যেসব অপ্রয়োজনীয় এবং বিরক্তিকর এসএমএস পাঠাতে থাকে এবং মাঝেমধ্যে কল করে বিবিধ অফার দেয়, তা গ্রাহক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত শান্তি বিনষ্ট করে। ঘুমানোর পরে এসএমএস -এর শব্দে ঘুম ভেঙে যায় এবং স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি কোন একটা ফালতু বিজ্ঞাপন অথবা কোন অফার। হলফ করে বলতে পারি, এ যাবত তারা যত শত বা যত হাজার অফার দিয়েছে, তার একটিও গ্রহণ করিনি বা গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি।

আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বহু অসঙ্গতির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে বহু রুল দেন। ফুটপাথে মোটরসাইকেল ওঠানো যাবে না––এমন নির্দেশনাও আমরা হাইকোর্ট থেকে পেয়েছি। পরিবেশ সম্পর্কিত অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালত দিয়েছেন। আমরা স্মরণ করতে পারি, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে একটি সাবানের বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামাল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দিয়েছিলেন। ওই বিজ্ঞাপনে মানুষকে প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এখন পর্য‌ন্ত কেউ মোবাইল ফোনের এসব ফালতু আর বিরক্তিকর এসএমএস বা ফোন কলের বিরুদ্ধে রিট করেছেন কি না জানি না। যদি না করে থাকেন তাহলে এখন সময় হয়েছে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার।

কারণ প্রতিদিন একই বিষয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এসএমএস পাঠিয়ে গ্রাহককে বিরক্ত করার অধিকার আমরা কাউকে দিইনি। বরং যখন-তখন আমাকে অপ্রয়োজনীয় এবং ফালতু জিনিস এসএমএস করে বিরক্ত করা পরিস্কারভাবে আমার ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন। সেই লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কী করছে––তা অবশ্য আমার জানা নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View