চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অর্থনীতির লাইফ সাপোর্ট কার অগ্রাধিকার?

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দম্পতি এস্থার দুফলা ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথোপকথনভিত্তিক সাক্ষাৎকার শুক্রবার প্রকাশ করেছে আনন্দবাজার পত্রিকা। তারা দু’জনে একমত হয়েছেন, এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষের জীবন বাঁচানো। অদূর ভবিষ্যতে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে তাদের কাজে ফেরানো। তার পরবর্তী সময়ের সমস্যা- স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়া। আজ আমরা প্রাণ বাঁচাতে যা করছি (লকডাউন, মানুষকে ঘরে রাখা), তার পরিণাম বড় হতে হতে যেন ভবিষ্যতে জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে না দাঁড়ায়- সেটা দেখতে হবে।

তারা আলোচনায় আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এখন কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক টাকা ছাপাক, মূল্যস্ফীতির ভয় না করে। এই টাকা কী করে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন একটু বেপরোয়া হওয়ার সময়। কেইনস-এর দেখানো পথে হাঁটার সময়।

বিজ্ঞাপন

জন এম কেইনস ১৯৩০-এর দশকের মন্দার অভিজ্ঞতায় অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের জন্য সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাহিদায় গতি আনতে কর হার কমানোর কথা বলেছিলেন। করোনা বিশ্ব অর্থনীতিকে যেভাবে কোমায় নিয়ে চলেছে তা থেকে বাঁচার জন্য লাইফ সাপোর্ট অবশ্যই দরকার। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা তো পরের কথা, শত শত কোটি মানুষ কেবল কেবল বেঁচে থাকার জন্য সরকারের কাছ থেকে বা অন্য কারও কাছ থেকে জরুরি সহায়তা চাইছে।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ লন্ডনের এক নারী ট্যাক্সি চালকের আকুতি দেখছিলাম একটি টিভি চ্যানেলে। তিনি বলেন, রাতারাতি আমার উপার্জন ভ্যানিশ।আমি কর্মহীন হয়ে পড়েছি এবং আমার কোনো সঞ্চয় নেই। সামাজিক নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। বাংলাদেশে লক্ষাধিক উবার-পাঠাও এবং এ ধরনের রাইড শেয়ারিংয়ের চালকের কথা ভাবুন একবার। রিকশা চালকদের কথা ভাবুন। দিনমজুরদের কথা ভাবুন। ভাসমান যৌন কর্মীদের কথা ভাবুন। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের কথা ভাবুন। বিনোদন জগতের শিল্পী-কলাকুশলীদের কথা ভাবুন।
আবার ধনবানদের প্রতিনিধিরা বলছে, তাদের কথা আগে এবং সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি উন্নত দেশের অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেওয়ায় জেনারেল মোটরস ও ফোর্ডসহ কয়েকটি মোটর গাড়ি উৎপাদক জায়ান্টরা দাবি করছিলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ। ওয়াশিংটনে এ সব প্রতিষ্ঠানের সিইওরা এসেছিলেন ব্যক্তিগত জেট বিমানে। ক্ষুব্ধ কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য তাদের বলেন, ‘ভিক্ষা চাইতে এসেছেন ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জেট বিমানে, লজ্জা করে না?’

বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা দেড় লাখ কোটি টাকার মতো। অনেকে নানাপ্রভাব ও কূটকৌশল খাটিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়েছে। খেলাপি ঋণের হিসাবে এ অর্থও যোগ করা দরকার। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৫০ লাখ লোক সরাসরি কাজ করছে। রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগ আসে এ খাত থেকে। এ খাতের মালিকদের দুটি সংগঠন রয়েছে- বিজিএমইএস ও বিকেএমইএ। করোনা সংকটের শুরু থেকেই তাদের হা-হুতাশ আমরা শুনছি। বলা হচ্ছে, শত শত কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। তারা বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ চাইছেন সরকারের কাছে। এর পেছনে কিছু যুক্তিও রয়েছে। তবে তাদের এটাও জানা থাকার কথা, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এখন যে ১২ লাখ কোটি টাকার মতো আমানত রয়েছে, তার ৭০ ভাগের বেশি প্রাইভেট ব্যাংকে। একইসঙ্গে ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক, শিল্প-বণিক সমিতি বা চেম্বারের নেতা- এমন লোক কম নয়। বিজিএমইএসহ যারা প্রণোদনা প্যাকেজ চাইছেন, তারা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ও সহজ শর্তে ঋণ পাবার বিষয়ে আলোচনা শুরু করতেই পারেন। সরকার কেন তাদের অর্থ দেবে? এ ক্ষেত্রে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ হবে উপযুক্ত গাইডলাইন তৈরি করে দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংককে বলতে হবে- প্রকৃত উদ্যোক্তারা যেন ঋণ থেকে বঞ্চিত না হয়। দুঃসময়ে ব্যাংকগুলোকে যতটা সম্ভব কম লাভ করতে হবে, এটাও বলে দেওয়া চাই। ব্যাংকের তহবিল বাড়ানোর বিষয়েও সরকারকে সহায়তা দিতে হবে।

বস্ত্রখাতযেসব পোশাক কারখানা এবং আরও অনেক শিল্প তাদের প্রোডাক্ট যুগোপযোগী করতে পারবে, তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের কথা ভাবতে হবে। অনেক কারখানা ব্লাউজ-টি শার্ট-জ্যাকেটের পরিবর্তে চিকিৎসকদের পারসোনাল প্রটেকশন সরঞ্জাম (পিপিই) উৎপাদন করতে শুরু করেছে। উন্নত বিশ্বে এর বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। দেশেও এখন বড় বাজার। আমাদের ওষুধ কোম্পানিগুলোর সামনেও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে স্যানিটাইজার রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। বার বার হাত ধোয়ার প্রথা বিশ্বব্যাপী ঘরে ঘরে চালু হওয়ায় সাবানের ব্যবসাও জমজমাট। করোনার অনুমোদিত ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়া হলে তার হিস্যা যেন স্কয়ার, ইনসেপ্টা প্রভৃতি কোম্পানিগুলো পায় সে জন্য জোর তৎপরতা চাই।

বিজ্ঞাপন

সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রতি। দেশে ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে, এমন অ্যাকাউন্ট সংখ্যা এখন লক্ষাধিক। বড় উদ্যোক্তাদের রয়েছে ব্যাংকের মালিকানা। উদ্যোক্তাদের নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েই দেখা গেছে, ‘পরস্পরের পিঠ চুলকানি’। ব্যাংকের পরিচালক-চেয়ারম্যানরা নানা কৌশলে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা দেন। এর ফলে ব্যাংকের মালিকানায় যাদের ভাগ নেই তাদের অনেকে বঞ্চিত হন। ক্ষুদ্র এমনকি মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা পড়েন এ কাতারে। বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই তাদের কথা ভাবতে হবে। আমাদের ব্যাংকিং খাতের অনেক গলদ। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ধনবান শ্রেণির চাপ ও রক্তচক্ষুকে ভয় পেয়ে অনেক ছাড় দিয়েছে। রাজনীতির স্বার্থে অর্থনীতির স্বার্থ উপেক্ষা করেছে। করোনা ক্রাইসিস শুরু হতে না হতেই ধনবানরা মাঠে নেমেছে প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য। সন্দেহ নেই, অনেক দাবি যৌক্তিক। কিন্তু এতদিন যারা দাবি করে এসেছেন যে অর্থনীতির চাকা তারাই সচল রাখছেন, তারা কেন ধাক্কার শুরুতেই বলছেন- আমাদের কোমর ভেঙে পড়েছে?

সরকারকে অবশ্যই ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক নীতিগত সহায়তার মাত্রা বাড়াতে হবে। অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে, বিশ্ব্যাপী সংরক্ষণবাদী মনোভাব বাড়বে। আমদানি কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদনের ওপর অনেক বেশি জোর পড়বে। দেশের বাজারকে প্রধান্য দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সুবিধা হচ্ছে কৃষি। সামান্য প্রণোদনা পেলে দেশের অনেক এলাকার কৃষক বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন করতে পারে। মাছ-শাকসবজি-ফল-হাঁসমুরগির মতো খাতের সম্ভাবনাও প্রচুর। কোন খাত থেকে বেশি সুফল মিলবে, এটা সরকারকে ঠিক করতে হবে। যারা সরকারের কাছ থেকে সহায়তা নেবে, তাদের কাছে স্পষ্ট করে বলতে হবে- কোনো কর্মী ছাঁটাই চলবে না। যারা ঋণ নিয়ে দেশের বাইরে পাচার করবে, তাদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। অর্থ পাচারের বিস্তর নজির রয়েছে আমাদের দেশে। এতদিন তা উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু এখন সরকার নিরুপায়।

সরকারকে এটাও মনে রাখতে হবে, কৃষি খাতে যে সব প্রণোদনা দেওয়া হবে তার পুরোটাই কিন্তু ব্যয় হবে দেশের ভেতরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে, এমন কথা বলেছেন ডিজিটাল কনফারেন্সে। এ কাজে যারা অগ্রণী ভূমিকা রাখবে তারা ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পায় সেটা নিশ্চিত করা চাই। এটাও মনে রাখতে হবে, জিডিপিতে কৃষির হিস্যা ১১-১২ শতাংশ হলেও শ্রম বাজারে সবচেয়ে বড় খাত এই কৃষি। ৪০-৪৫ শতাংশ কর্মী সরাসরি নিয়োজিত এ খাতে। এ খাতই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছে। পেটের ভাত-সবজি-মাছ নিশ্চিত থাকলে আমরা অর্থনীতির অন্যান্য শাখার সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে পারব অনেকটা কম দুশ্চিন্তায়। এ কারণেই বলব, কৃষকদের প্রয়োজনে বিনা সুদে ঋণ দিন। সেচের পানির জন্য বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়লে লাইন যেন কাটা না হয়। সারের দাম সম্ভব হলে কমিয়ে দিতে হবে। হাঁসমুরগির খামারে খাদ্য ও ওষুধ যেন সহজলভ্য হয়।

সরকারের ঋণ বাড়বে, এটা নিশ্চিত। ১৯৯৮ সালের বড় বন্যার সময় অর্থমন্ত্রী এস এ এম এস কিবরিয়া একাধিকার আমাকে সরকারের প্রচুর ব্যাংক ঋণ গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, উৎপাদনমুখী কাজের জন্য ঋণ নিচ্ছি। অবকাঠামো সম্প্রসারণে ঋণ নিচ্ছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ঋণ নিচ্ছি। এর সুফল ভবিষ্যতে মিলবে।

তবে সরকারকে অবশ্যই ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। সরকারি প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ নয়ছয় হয়, এটা সর্বজনবিদিত। এখন এ যুগে সব অচল হবেই। নতুন এক বিশ্ব আমাদের দেখতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে, পুঁজিবাদ-ধনবানদের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ধনবান দেশ পারমাণবিক বোমা এবং বহু ধরনের মারণাস্ত্র তৈরির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে। তারা বলেছে- নিরাপত্তার জন্য এ সব করা হচ্ছে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রবাহী নৌবহরের নাবিকদের জীবন বিপন্ন করছে অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাস। ধনী-দরিদ্র, গায়ের রং, ধর্ম, নারী-পুরুষ- কোনো কিছু বাছবিচার না করে ২০০ দেশের ৭০০ কোটি মানুষকে এ ভাইরাস নাকাল করে চলেছে। এ সত্য কেমন করে উপেক্ষা করবেন?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)