চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া নাকি আত্মহত্যার পথে পা বাড়ানো

বেঁচে থাকার জন্য মানুষের ‘স্বপ্ন’ থাকা জরুরি। নিজের সুন্দর জীবন গড়ার পাশাপাশি স্বপ্নে ভর করে পরিবার, সমাজ, দেশ এমনকি গোটা পৃথিবী বদলে দেয়া যায়। স্বপ্ন ছুঁতে কেউ পাড়ি জমান বিদেশে। এজন্য অনেকে অসাধুদের খপ্পরে পড়ে বিপদজনক পথে পা বাড়ান। মানুষের সরল স্বপ্নকে পুঁজি করেই নিজেদের স্বার্থে অন্ধ হয়ে ওঠে দালাল ও পাচারকারীরা। স্বপ্ন পূরণের প্রলোভন দেখিয়ে হত্যাকারীর মতো মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। যুক্তরাজ্যের এসেক্সে ২৩ অক্টোবর একটি ফ্রিজিং মালবাহী গাড়িতে পাওয়া গেছে ৩৯ জনের মরদেহ। ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপের কোনো দেশে অভিবাসন প্রত্যাশী ছিলেন তারা।

উন্নত জীবনের হাতছানিতে ফ্রান্সে যেতে চেয়েছিলেন সিলেটের ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। স্লোভাকিয়ার জঙ্গলে তার জীবন থেমে গেছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে তিনি রাশিয়া গিয়েছিলেন। এক মাস পর ইউক্রেনে। সেখান থেকে ফ্রান্সে যেতে দালাল ধরেন। দেশে ওই দালাল চক্রের সদস্যদের কাছে ৭ লাখ টাকা জমাও দেয় ফরিদের পরিবার। দালাল বলে, দুই ঘণ্টা হেঁটে আর বাকিটা বৈধ পথে গাড়িতে করে ফ্রান্সে পৌঁছানো যাবে। এ বছর ২৮ আগস্ট ফরিদসহ কয়েকজনকে নিয়ে দালাল ফ্রান্সের উদ্দেশে রওনা হয়। দুই ঘণ্টার হাঁটা পথ দুই দিনেও ফুরায় না। ৩০ আগস্ট স্লোভাকিয়ার জঙ্গলে পৌঁছান ফরিদরা। ক্লান্তি আর খাবার সঙ্কটে ফরিদ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দলছুট হয়ে নিখোঁজ। ক’দিন পর স্লোভাকিয়ার স্টারিনা জঙ্গল থেকে ফরিদের মরদেহ উদ্ধার করে দেশটির পুলিশ। তারও কয়েকদিন পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর আসে।

বিজ্ঞাপন

একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে এরকম কতো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। দ্য ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন অফ মাইগ্রেশন-আইওএম এর ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট ২০১৯’ এর হিসাবে, পয়লা জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ২২ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত অবৈধ অভিবাসনের সময় ৩৩ হাজার ৬শ’ ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইওএম স্পষ্ট করেই বলছে, এটি বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খণ্ডিত চিত্র। মৃত ও নিখোঁজের আসল তথ্য অজানা।তৃতীয় জাহাজের অভিবাসীদের নেবে ইইউ

বিজ্ঞাপন

অবৈধভাবে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে সাগরে নৌকাডুবিতে মৃত্যু কিংবা সাগরে দিনের পর দিন ভেসে বেড়ানোর খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। তাদের অনেকেই বাংলাদেশি। খাবার আর নিরাপদ পানির অভাবে তাদের সাগর কিংবা বিদেশের জঙ্গলে অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটানোর খবরও পাওয়া যায়। কারও ঠাঁই হয় বিদেশের অভিবাসী কেন্দ্র বা কারাগারে। আবার চড়াই উতরাই পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশে পৌঁছাতে পারলেও দিন কাটে শঙ্কায়, বৈধ কাগজ না থাকায় এই বুঝি পুলিশ ধরলো! কাজের খোঁজে গিয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন অনেক নারী।

অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টার সময় দেশেও নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে অনেকে ধরা পড়ছেন। বিজিবি এ বছর জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়া ও পাচারের শিকার শিশুসহ ৩শ’ ৪১ জনকে আটক করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযানে ধরা পড়ছে দালাল চক্রের সদস্যরাও।

বিজ্ঞাপন

বিদেশে যেতে চাওয়াদের বড় একটা অংশ প্রধানত বেকারত্বের কারণে দেশ ছাড়তে চান। চাকরির ছোট বাজার, তার ওপর তদবিরবাজি, পদে পদে দুর্নীতি আর হয়রানির কারণে অনেকটা নিরুপায় হয়ে তারা কষ্টেসৃষ্টে টাকা যোগাড় করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করেন। আশা, বিদেশে গেলেই আর্থিক সঙ্কটের সমাধান হবে। পরিবারের দুঃখ ঘুচবে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কর্মসংস্থানের অভাব আর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমানভাবে সবার কাছে না পৌঁছানোয় নানা প্রলোভনে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছেন তরুণরা। মানব পাচার বিষয়ে গবেষকরা বলছেন, বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার সীমিত সুযোগ এবং পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় পাচার কমছে না।

এতো গেলো কর্মসংস্থানের খোঁজে বিদেশ যেতে চাওয়াদের কথা। কিন্তু দেশে জীবিকা থাকার পরও তো অনেকে বিদেশের মোহে থাকেন। এই যে ফরিদ, তিনি তো দেশে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন। স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তিন বছর বয়সী কন্যা রয়েছে তাদের। আপাত দৃষ্টিতে বোঝা যায় দেশে ভালোই ছিলেন। দালাল চক্রকে ৭ লাখ টাকা দেয়ার বিষয়টিতেও ফরিদের আর্থিক অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়। তারপরও আপনজন, পরিচিত গণ্ডি, চাকরি- সব পিছুটান ছেড়ে জীবন বাজি রেখে বিদেশ যাওয়াটা কেন জরুরি হয়ে পড়েছিল? পদে পদে ঝুঁকির কথা জেনেও কেন একরকম আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন?ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি-অভিবাসী-যুক্তরাজ্য-ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদেশে যেতে চাওয়াদের অনেকেই আছেন যারা নাগরিক সুবিধার অভাব আর নানা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির আশায় দেশ ছাড়তে চান। দেশের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা এতোটাই বেশি থাকে, বিদেশে যেতে তারা হাজারো ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যসহ দেশের প্রতি মমতার অভাব বিদেশের প্রতি তাদের মোহ বাড়িয়ে দেয়। কারও কারও মানসিকতা এমন যে, বিদেশের সবকিছুই ভালো। এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। আর এই প্রবণতা বেড়েও চলেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও দেশ নিয়ে অভক্তি আর হতাশা আশঙ্কাজনকভাবে ছড়াচ্ছে। আগামী প্রজন্মের বড় অংশ এমন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠলে দেশের ভবিষ্যত কী?

নিজেদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হওয়া আর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। আর তা হলেই প্রবাস জীবনের হাতছানিতে অবৈধ পথ বেছে নেয়া কমবে। পদে পদে ঝুঁকির তোয়াক্কা না করে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বন্ধ করা যাবে। পাচারকারীর হাত থেকে রক্ষা পাবে অনেক মানুষ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)