চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অবশেষে তামিম চৌধুরীর ‘অভিযান’ শেষ!

সরকার ও পুলিশ চাইলে যে পারে-তার প্রমাণ আবারও পাওয়া গেল। একদিন আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, শুধু জঙ্গি নয়, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনায় রয়েছে রাজনৈতিক মদত। গুলশান হামলার সেই মাস্টারমাইন্ডদের ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়ে গিয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে পুলিশ এই মাস্টারমাইন্ডদের গ্রেফতার করতে পারে। এর পরদিনই পুলিশের গুলিতে নিহত হলো গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম আহমেদ চৌধুরী। নিহত তার তিন সঙ্গীও।

গত ২ জুলাই গুলশান হামলার পর থেকেই তামিমকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে দাবি করছিল পুলিশ। তার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি অভিযানও চলছিল। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার একটি বাড়িতে তামিম লুকিয়ে রয়েছে বলে শনিবার ভোর রাতে গোপন সূত্রে খবর পায় পুলিশ। তারপরই সেখানে হানা দেয়ে সন্ত্রাস দমন শাখার একটি দল। ভোর থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখলেও, সকাল ৯টা নাগাদ গুলি বিনিময় শুরু হয়। তার এক ঘণ্টার মধ্যেই তামিম ও তার তিন সঙ্গীকে খতম করে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

এই অভিযানের পর যথারীতি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ কেন তাদের জীবিত ধরতে পারল না, কেন খুন করল, এটাই তামিম কী-না, এমন নানা প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছে। প্রশ্ন থাকবেই। যে কোনো কাজেরই সমালোচনা করা যায়। এর আগে কল্যাণপুর এবং সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে পরিচালিত পুলিশের অভিযানও প্রশ্নমুক্ত নয়। আর আমাদের দেশে জঙ্গি-সমর্থকরা সরকার ও পুলিশের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সব সময়ই উদগ্রিব থাকে।

শুধু তাই নয়, সরকার ও পুলিশের যে কোনো উদ্যোগের সমালোচনা করে এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের ‘নিরপেক্ষ ভূমিকাকে’ বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপাত করেন। তারপরও জঙ্গি দমনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করতে হয়। গুলশান হামলার পর সরকার ও পুলিশ যা করেছে, যা করছে-তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য-গুলশান হামলার পর দেশে আর কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। সারাক্ষণ বন্দুকের নলের আগায় রাখলে, দৌড়ের মধ্যে রাখলে জঙ্গিরা দুর্বল হতে বাধ্য-এটাই প্রমাণিত হয়েছে। জঙ্গিবাদ যতই বৈশ্বিক ইস্যু হোক, সরকার তৎপর হলে সেটা শিকড় গাঁড়তে পারবে না-এটাই বাস্তব সত্য।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইরাকের মত বাংলাদেশ এখনও জঙ্গিদের জন্য ‘অনুকূল ভূমি’ হিসেবে গড়ে উঠেনি। যদিও এখানে ধর্মবাদী অনেক মানুষ আছে, যারা জঙ্গি-উত্থানকে সমর্থনকে করে, কিন্তু নিজে কোনো দায়িত্ব ও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। আওয়ামী লীগের কাছে নাস্তানুবাদ হওয়া বিএনপি-জামায়াতের কর্মী, উগ্রধর্মবাদী পাকিস্তানপন্থী দল, সাম্প্রদায়িকতাপুষ্ট ভারতবিরোধী শক্তি-এরা কমবেশি জঙ্গিবাদের সমর্থক হলেও কেউ-ই ‘জঙ্গিবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হতে রাজি নয়।

কারণ জঙ্গিবাদ যে ভুল মতাদর্শ, ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা, ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনি’ হওয়ার মন্ত্রণা দেয়-সেটা দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষই সমর্থন করে না। এই বোধটি আরও বেশি করে ছড়িয়ে দিতে পারলে এই ভ্রান্ত মতাদর্শের মোহ থেকে মানুষ সরে আসবে বলেই অভিজ্ঞমহল মনে করেন।

আপাতত পুলিশের কাজ হবে তামিমের সঙ্গিসাথীদেরও খুঁজে বের করা। উল্লেখ্য, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী গুলশান এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল পুলিশ।

বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী দেশে ফিরে আত্মগোপন করে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তিনি কিশোর-যুবকদের ভুল-ভাল বুঝিয়ে জঙ্গি বানানো, তাদের দিয়ে আক্রমণ পরিচালনার সফল অভিযান পরিচালনা করছিল।এ কাজে অকাতরে টাকাও বিলিয়েছে। তামিম চৌধুরী সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আরও কয়েকজনের সঙ্গে তামিম চৌধুরীই দেশীয় জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এদিকে পুলিশ তামিমকে জেএমবি নেতা বললেও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের বিভিন্ন প্রকাশনায় দাবি করা হয়, তিনি সংগঠনটির বাংলাদেশ শাখার সমন্বয়ক। এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও তাকে আইএস সমন্বয়ক হিসেবে উল্লেখ করেছে। আবু ইব্রাহিম আল হানিফ ওরফে তামিম নির্দেশেই আইএসের বাংলাদেশ শাখা ভারত ও মায়ানমারে নাশকতার পরিকল্পনা করে।

বিজ্ঞাপন

আইএস মুখপত্র বলে পরিচিত ‘দাবিক’ ম্যাগাজিনের ১৪তম সংখ্যায় এমনটাই লেখা হয়েছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ, অসম-মেঘালয়ের কিছু অংশ, ত্রিপুরা ও মায়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এক জঙ্গি বাংলা প্রদেশ তৈরি করা হবে। কট্টর ইসলামি আদর্শই হবে এই রাষ্ট্রের আদর্শ। সেই প্রস্তুতি শুরু করে আইএসের বাংলাদেশ শাখার প্রধান আবু ইব্রাহিম ওরফে তামিম চৌধুরী।

একটি ভ্রান্ত আদর্শে দীক্ষিত হয়ে ধর্মের নামে মানুষ খুনের যে ‘উৎসব’ তামিম চৌধুরী শুরু করেছিল, এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও অনেকের ভূমিকা আছে। এ মুহূর্তে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে আরও যারা সহযোগী ও মদদদাতা রয়েছে তাদের খুঁজে বের করাটাই বড় কাজ। জঙ্গি ইস্যুতে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেখা গেছে, জঙ্গিরা হয় ভারতে বসে বাংলাদেশে হামলার পরিকল্পনা করছে অথবা হামলার পর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ভারত সরকারের সহযোগিতা আদায় করে নেয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।

সম্প্রতি ভারতে ঢাকার গুলশানে আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনার ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে চার বাংলাদেশি যুবককে গ্রেপ্তার করেছে অসম পুলিশ। ধৃতরা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বাংলাদেশ শাখা জেএমবি’র (নিউ) সঙ্গে যুক্ত। তারা হামলাকারীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করেছিল বলে জানা গিয়েছে। ভারতীয় পাসপোর্ট জোগাড় করে আইএস-এর এই সহমর্মীরা সিরিয়া পালানোর ছক কষেছিল। সীমান্ত পার হয়ে এই জঙ্গিরা ভারতীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদনও করেছিল। এমনকী ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ডও বানিয়ে নিয়েছিল তারা। 

গুলশান হামলার কয়েকদিন পরেই তারা সিলেট দিয়ে ভারতে পালিয়ে সম্প্রতি দলের এক সদস্য ইজাত আলি আচমকাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। একটি গাড়িতে চাপিয়ে ইজাতের দেহ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বড়গুল-চামলা গ্রামে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় এই চার বাংলাদেশি জঙ্গি। ধৃত চার জঙ্গি হলো, সুমন আহমেদ ওরফে কামালউদ্দিন, দিলওয়ার হোসেন ওরফে জামালউদ্দিন, সাবির আহমেদ ওরফে বসিরউদ্দিন ও শাহিদ আহমেদ ওরফে হারিসউদ্দিন।

ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এই চার জঙ্গিকেও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি বিমান বন্দরের নিরাপত্তাও বাড়াতে হবে। এখন পর্যন্ত যারা বড় হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের অনেকেই বিমানবন্দর দিয়েই দেশে প্রবেশ করেছে। বিমান বন্দর দিয়ে কারা দেশে আসছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড কী, কোথায় কী করেছে, বাংলাদেশে কোথায় গিয়ে উঠছে-এসবও গোয়েন্দা-নজরদারিতে থাকা উচিত।

আরেকটি কথা, সরকার জঙ্গিদের দেখামাত্র গুলি করে মেরে ফেলবে, নাকি তাদের গ্রেপ্তার করে তথ্য আদায় করবে, তারপর প্রচলিত পদ্ধতিতে বিচারের আওতায় নিয়ে এসে এক ধরনের ‘আইনের শাসনের’ নামে ‘জঙ্গি পুনর্বাসন’ প্রক্রিয়া চালু করবে-সে সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। সমালোচকদেরও আত্মসমালোচনা করতে হবে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জন্য নরহত্যাকারীদের শায়েস্তা কারা এই দাওয়াই কার্যকর হয়-তাহলে আপত্তির কী আছে?

আর পুলিশ যদি অন্য সোর্স থেকেই সঠিক তথ্য পায়, তাহলে আর ‘মাস্টারমাইন্ড’কে বাঁচিয়ে রেখেই বা লাভ কী? এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে যারা মরার দীক্ষা নিয়ে জঙ্গি হয়, তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া এত সহজ নয়। এর আগে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুলও জানিয়েছিলেন, ‘জঙ্গিদের এমনভাবে মোটিভেট করা হয়, পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও তাদের কাছ থেকে তথ্য উদ্ধার করা যায় না।

প্রশিক্ষণের সময় মাস্টারমাইন্ডরা তাদের শেখায় যে, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে নিজেকে মৃত বা শহিদ মনে করতে হবে। মৃত মানুষ যেমন কোনও তথ্য দিতে পারে না, তেমনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না।’

এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বলতে চাই, পুলিশ যা করছে, যেভাবে করছে-এতে যদি জঙ্গিবাদ নির্মূল হয় তাহলে তা সমর্থন করি। আর সমালোচকদের উদ্দেশে বলি, জঙ্গিরা যখন চাপাতির কোপে জীবন কেড়ে নেয়, যখন সন্তানসম্ভবা একজন নারীকে জবাই করে হত্যা করে, তখন তারা কোন নীতি, কোন ধর্ম, কোন আইন মেনে চলে? এই নরপশুদের খতম করার ব্যাপারে যদি ‘ব্যাকরণে’ কিছু ভুল হয়, ‘মহাভারত’ একটু অশুদ্ধ হয় হোক!

(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View