চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘অপুর সংসার’ এর ৬০ বছর

৬০ বছর আগে ১৯৫৯ সালের ১ মে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবির মাধ্যমে দুটি নতুন মুখের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল দর্শক। এই নতুন দুটি মুখই ভারতের সিনেমায় অমূল্য দুই রত্ন হয়ে উঠেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স তখন বিশ বা তার কিছু বেশি। আর শর্মিলা ঠাকুর তখনও টিনএজার। তাদের দুজনের জুটি, পর্দার মিষ্টি প্রেম মন কেড়ে নিয়েছিল দর্শকের। ‘অপুর সংসার’ জিতে নেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের সম্মান।

বিজ্ঞাপন

সিগারেটের প্যাকেটে শর্মিলা ঠাকুরের লিখে দেয়া ‘খাওয়ার পরে একটা করে-কথা দিয়েছো’ অথবা আরেকটু বেশি সময় সৌমিত্রকে পাশে পাওয়ার জন্য টিউশনি ছেড়ে দিতে বলার দৃশ্যগুলো এখনও মুগ্ধতা তৈরি করে। বর্তমান সময়ের নির্মাতারা এখনও অনুপ্রেরণা পান ৬০ বছরের পুরানো এই সিনেমা থেকে। ‘অপুর সংসার’ এর ৬০ বছরে ছবিটি নিয়ে কথা বললেন বর্তমান সময়ের কয়েকজন নির্মাতা।

অতনু ঘোষ: অসংখ্যবার দেখেছি অপুর সংসার। প্রথম দেখেছি যখন টিনএজার ছিলাম, শনিবার সন্ধ্যায় দূরদর্শনে। এত ভালো লেগেছিল যে ছবির ঘোর কয়েকদিন কাটেনি। আমাদের জেনারেশনের যে কেউ নিজেকে অপুর স্থানে কল্পনা করতে চাইবে। চরিত্রটির জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পুরোপুরি মানানসই ছিলেন। এক বছর আগে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউটে ছবিটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বসে দেখার। যখন শর্মিলা ঠাকুরের নিষ্পাপ চেহারাটা পর্দায় ভেসে উঠে, তখন অদ্ভুত ভাবে সেই টিনএজ এর রোমান্টিসিজম অনুভব করি। আমার চেহারা দেখে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি হারিয়ে গেছো?’ আমি আসলেই হারিয়ে গিয়েছিলাম ভালোবাসা, কষ্ট এবং সত্যজিত রায়ের তৈরি অপু-অপর্ণার জগতে। ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে, দৃশ্যগুলো এখনও মুগ্ধতা তৈরি করে।

গৌতম ঘোষ: চল্লিশ বছর আগে ছবিটি প্রথম দেখেছিলাম, খুবই রোমান্টিক মনে হয়েছিল। ট্র্যাজেডিও ছিল। অপুর লেখক হওয়ার ইচ্ছাটা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। একজন নির্মাতার নজরেও ছবিটি দেখেছিলাম। এরপর সময়ের সাথে সাথে ছবিটিতে ফুটিয়ে তোলা মানব জীবনের নানা দিক বুঝতে পারি। ছবির টেকনিক্যাল দিকগুলোও বোঝার চেষ্টা করি। ইনডোর এবং আউটডোরে ধারণ করা দৃশ্যগুলো সত্যজিত রায়, সুব্রত মিত্র এবং বাণী চন্দ্রগুপ্ত তিনজন মিলে করেছিলেন। অপু যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করছিলেন এবং বলছিলেন যে মেধাবীদের আয় করার জন্য চাকরী করার প্রয়োজন নেই, সেটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। দৃশ্যটিতে আসলে সত্যজিত রায়ের আত্মউপলব্ধি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুরের জুটি ছিল দারুণ আবিষ্কার।

অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী: সাহিত্য উপাদানকে কীভাবে সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা যায় তার দারুণ নিদর্শন হলো ‘অপুর সংসার।’ সত্যজিত রায় নিজেই তার অনেক লেখা এবং সাক্ষাৎকারে ছবিটির উদাহরণ দিয়েছেন। এই ছবিতে সত্যজিত রায় রোমান্টিক সম্পর্ক এবং দাম্পত্য জীবন নিয়ে প্রথম বারের মতো এত গভীরভাবে কাজ করেছেন। রোমান্সের সঙ্গে নানা সংগ্রাম ছিল ছবিতে। অপুর জীবন দেখলে ১৯৩০ এর দশকের বাংলার গ্রামীণ মূল্যবোধ এবং উদীয়মান শহুরে সংগ্রাম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ছবির কিছু দৃশ্য এতটাই শক্তিশালী যে সেগুলো আমার হৃদয়ে চিরজীবন থাকবে।

সন্দীপ রায়: অপুর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেয়া হয় ১৫ থেকে ১৭ বছরের মেয়েদের ছবি চেয়ে। এক হাজারের বেশি ছবি পাওয়া গেলেও ইন্টার্ভিউতে ডাকার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি। খুবই বিপাকে পড়ে যাওয়া সেই পরিস্থিতিতে শোনা যায় শর্মিলা ঠাকুরের নাম। শর্মিলা ঠাকুর তখন থিয়েটারে নাচ করতেন। সত্যজিত রায়ও শর্মিলা ঠাকুরের মেধার কথা শুনে ছিলেন। তাই ছবির ব্যাপারে শর্মিলা ঠাকুরের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এভাবেই শর্মিলা হয়ে উঠেন অপর্ণা।