চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অন্যরকম সেঞ্চুরির সামনে বাংলাদেশের ‘বিখ্যাত পাঁচ’

প্রসঙ্গ: মাশরাফী-তামিম-সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ

তাদের একসূতোয় বাঁধতে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ শব্দটা এখন হরহামেশাই ব্যবহার হয়। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ; বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনালি সময়ের এ পঞ্চক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে টাইগার ক্রিকেটকে এনে দিচ্ছেন বহু স্মরণীয় সাফল্য। এবার তারা দাঁড়িয়ে অন্যরকম এক সেঞ্চুরির সামনে।

মঙ্গলবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে যদি তারা সকলেই একাদশে থাকেন, তাহলে একত্রে ১০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনন্য গৌরবে নাম লেখাবেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ দল এমন একশটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ফেলবে যাতে এই পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই মাঠে নেমেছিলেন।

বিশ্বক্রিকেটে কম-বেশি জুটি বাঁধার এমন ঘটনা আছে অন্তত ৬৪টি। কিন্তু পাঁচজনের জুটি বেঁধে এমন মাইলফলক ছোঁয়ার ঘটনা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বিরলই! যেখানে বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট বা নির্বাচকরা সিনিয়র ক্রিকেটারদের প্রতি খুব সদয় অনুভূতি প্রদর্শন করেন না বলে কথা আছে!

বাংলাদেশের এই বিখ্যাত পাঁচ প্রথমবার জুটি বাঁধেন সেই ২০০৭ সালে। ২০১৮ পর্যন্ত নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে তাদের ক্যারিয়ার। এখনও দলের মূল কাণ্ডারি তারাই। তরুণরা এসে গতি দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু মাঠে ব্যাট-বলের তরী ভাসিয়ে তীরে নোঙর করাতে তাকিয়ে থাকতে হয় মাশরাফী, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর দিকেই।

একযুগের যাত্রায় সেঞ্চুরির পথে হাঁটার সময়টাতে যে ৯৯টি ম্যাচে একসঙ্গে মাঠে নেমেছেন এ পাঁচ টাইগার তারকা, তার ৪৭টিতে জয়ীর বেশে মাঠ ছেড়েছেন, ৪৮টি ম্যাচ জয়ে নোঙর ফেলতে পারেননি, আর ৪টি ম্যাচে আসেনি ফল। জয়ের গড় ২৯.৫ শতাংশ। সময়টাতে দল সর্বোচ্চ সংগ্রহ গড়েছে ৩৪৫ রানের, সর্বনিম্ন সেখানে ৫৮।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ জোহানেসবার্গে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথমবার একসঙ্গে নামেন এই পাঁচ টাইগার। ম্যাচটা জেতা হয়নি। জয়সুরিয়া-সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনেদের শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ৬৪ রানে হারতে হয়। লঙ্কানদের ১৪৮ রানের লক্ষ্যে নেমে ৮৩ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। আর ৯৯তম ম্যাচটি হয়ে গেল রোববার, মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ৫ উইকেটের জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এ পাঁচ জনই।

দীর্ঘ একযুগের যাত্রায় নিজেকে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে নিয়েছেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ও স্পিনার সাকিব আল হাসান। টাইগারদের টেস্ট ও টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক দাপটের সঙ্গে খেলে চলেছেন তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই। তামিম ইকবাল সেখানে টাইগারদের ব্যাটিং রেকর্ডের বেশিরভাগেরই মালিক। এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ওপেনিংয়ে ভরসা-দেশসেরা, খেলছেন তিন ফরম্যাটেই।

মাশরাফী সেখানে বখে যাওয়া হাঁটুর সঙ্গে যুদ্ধ করে একাধিকবার ক্যারিয়ারের কক্ষচ্যুত হতে বসেছিলেন। অনেকবার মাঠের বাইরে ছিটকে যেয়েও দম হারাননি। টেস্ট খেলেন না আনেকদিন থেকেই। টি-টুয়েন্টিও ছেড়েছেন। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে দেশের দলপতি তিনি। ২০১৫ থেকে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের যে বিস্ময়কর ঊর্ধ্বগামী সাফল্যরেখা, সেটি মাশরাফীর নেতৃত্বেই। দেশের সর্বোচ্চ ওয়ানডে উইকেট শিকারি এ পেসার এখনও সামনে থেকে নেতৃত্বে দিয়ে চলেছেন গতির বোলিংয়েও।

ডানহাতি ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম সেখানে মিডলঅর্ডারের স্তম্ভ। দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান। নেতৃত্ব দিয়েছেন একটা সময়, উইকেটের পেছনে গ্লাভসের দায়িত্ব সামলে চলেছেন দক্ষতার সাথে। আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ লেট-মিডলঅর্ডারে ইনিংস গড়া থেকে ঝড় তোলা, যখন যেভাবে দরকার বুক চিতিয়ে ভূমিকা রেখে চলেছেন দলের জন্য। প্রয়োজনের মুহূর্তে স্পিনেও কার্যকরী হয়ে ওঠেন এ ডানহাতি অলরাউন্ডার।

Advertisement

পাঁচ বিস্ময়ের জুটি বাঁধার সময়টাতে সব ফরম্যাটের ক্রিকেটে স্মরণীয় অনেক সাফল্য এসেছে টাইগারদের। ২০১৫ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছা। ওই বছরই দেশের মাটিতে ভারত, পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকার, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ছোট ফরম্যাটে সিরিজ জয় এসেছে।

শ্রীলঙ্কায় শততম টেস্টে জয়সহ অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়েও বড় ভূমিকা রেখেছেন সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি সিরিজ জয়ের পরে দেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় এসেছে এবছরে, ওয়ানডে সিরিজে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

তারা একসঙ্গে জুটি বাঁধার আগে ১৪৭ ওয়ানডের ১১৪টি হেরেছিল দল। পরের সময়টাতে তাদের উত্থানের সাথে সাথে লাল-সবুজের ক্রিকেটেরও উত্থান ঘটেছে সমান তালে। ২০১০ সালে, সময়টাতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪-০তে ওয়ানডে সিরিজ জয় এসেছে, যে সিরিজে তামিম-মাশরাফী চোটের কারণে খেলতে পারেননি। ২০১১ সালে এশিয়া কাপ উঁচিয়ে ধরার খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তারা। ওই বছরই ঘরে উইন্ডিজের বিপক্ষে ৩-২ সিরিজ জয়, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০তে জয়ের কীর্তি আছে।

মাশরাফী দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১৫ সাল থেকে তো বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা চলছে বাংলাদেশ দলের সাফল্য রেখায়। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ছাড়াও ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে উঠেছে টাইগাররা।

২০১৭ থেকে টি-টুয়েন্টি খেলছেন না মাশরাফী। কিন্তু ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে পাঁচজনের একসঙ্গে খেলা ৫০ ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের হার ৫৪ শতাংশ। তার আগের সাত বছরে যেটি ছিল ৪০ শতাংশের কম!

‘এটা সত্যিকার অর্থেই দারুণ একটি মুহূর্ত’ -মাইলফলকের কথা শুনে ক্রিকইনফোকে এভাবেই বলেছেন তামিম, ‘প্রায় ১৫ বছর ধরে আমরা একে অপরকে চিনি, একসঙ্গে অনেক চাড়াই-উতরাই দেখেছি, আশারাখি মাইলফলকের দিনটি আমরা স্মরণীয় করে রাখতে পারব।’

সেটি পারলে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়ে যাবে বাংলাদেশের। গত এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের কাছে শেষমুহুর্তে ম্যাচ হাতছাড়া, বছরের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল হার ছাড়া এবছর আসা দারুণ কিছু সাফল্যের পাশে আরেকটি পালক যুক্ত হবে টাইগারদের।

‘মাশরাফী ভাই এবং রিয়াদ ভাই বয়সে আমাদের বড়। আমি, সাকিব আর মুশফিক তো অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে একসঙ্গে খেলছি। আমাদের সবার মাঝে দারুণ সম্পর্ক।’ মাইলফলকের আগমুহূর্তে বলেছেন তামিম।

সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিবেদন, পারফরম্যান্স তার কাজটাকে সহজ করেছে বলে অকপটে জানিয়েছেন মাশরাফীও, ‘তারা সকলেই বড় পারফর্মার, যা মাঠের কাজগুলো সহজ করে দেয়।’

সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বড় টুর্নামেন্টেও অভিজ্ঞ এ সতীর্থদের কাছে দারুণ সব পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করছেন মাশরাফী। তামিমও বলছেন, ১৯৯০-এর শ্রীলঙ্কার সোনালিপ্রজন্ম যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, তেমন কিছু করতে। যাতে পরের প্রজন্ম সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আরও উন্নতির শিখরে টেনে নিতে পারেন।

ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতের গর্ভেই থাকছে আপাতত, বাংলাদেশের এই সেরা-পঞ্চক ও তরুণ মিরাজ-সৌম্য-মোস্তাফিজরা মিলে যদি দারুণকিছু করে দেখাতে পারেন, তাতে সামনের বছর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে মিলতে পারে দারুণ সাফল্যের দেখাও! সামর্থ্যটা তো তাদের আছেই।
ক্রিকইনফো অবলম্বনে