চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অধিকার বঞ্চিত নারী: নীরব সরকার, নীরব পৃথিবী

প্রাণী শিকার আর বনের ফলমূলের ওপর নির্ভরশীল অশান্ত প্রাগৈতিহাসিক সময়পর্বের এক অসাধারণ পর্যায়ে নারীর হাত ধরেই ঘটেছিল সর্বোচ্চ বিপ্লব। আবিষ্কৃত হয়েছিল মাটির উৎপাদন ক্ষমতা। এর আগে শিকারই ছিল জীবিকার প্রধান উপায়, পুরুষেরাই সাধারণত সেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতো। আর শিশুসন্তান আগলে রাখার দায়িত্ব নিয়ে গুহায় অবস্থান করা নারীরা আশপাশ থেকে ফলমূল ও শস্যদানাও কুড়িয়ে আনতো।

এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই ফলমূল আর শস্যের বীজ থেকে নতুন ফলের গাছের জন্ম দেখে পত্তন ঘটে কৃষির। অনিশ্চিত, অশান্ত আর হিংস্র শিকার-নির্ভর জীবন ক্রমশ শান্ত জীবনের দিকে মোড় নেয়, কৃষি চিহ্নিত হয় মানুষের সভ্যতার আদি স্তম্ভ হিসাবে।

কৃষিকাজে দীর্ঘ সময়, অধ্যাবসায় আর নিয়মিত যত্ন প্রত্যাশা করায় নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানের প্রবণতাও বৃদ্ধি পায় মানুষের মধ্যে, দূর হতে থাকে খাদ্য কেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা। আর এই অবকাশে মানুষ খাদ্য গ্রহণ, বর্জন আর সন্তান জন্ম দেওয়ার বাইরে জীবন জগতের অন্যান্য বিষয় নিয়েও ভাববার সুযোগ পায়। এরফলে ক্রমেই উদ্ভব ঘটে ধর্ম, সামাজিক অনুশাসন আর শিল্প সাহিত্যের।

চাষবাস তথা নারীর উদ্ভাবিত কৃষি এভাবেই মানুষের সভ্যতার শুরুতে প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্ত হালে যুগ পরিবর্তন হয়েছে। নারী সমভাবে ঘরে ও বাইরে নানামুখী শ্রমের সঙ্গে জড়িত। তার কোনো শ্রমকে ছোট করে বা তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ আজ কারোরই নেই। কারণ সব কাজে নারীর পারদর্শিতা এখন দৃশ্যমান। আর সেটাই বাস্তবতার দৃষ্টান্ত। কিন্ত সবাই নারীদের দৃশ্যমান কাজের কথা বললেও স্বীকৃতি নেই তাদের কাজের।

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। এখানে গত দেড় দশকে অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে দ্রুত বর্ধনশীল দেশের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে। কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বৈদেশিক আয় ও জিডিপির হার উর্ধ্বমুখী। দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রায় উঠে গেছে। তবে সুশাসন বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের অধিকার এখনো অর্জিত হয়নি। এখনো নারীরা নানাভাবে ঘরে-বাইরে লাঞ্ছিত হচ্ছে। নারীদের সমস্যার কথা অনেকে মুখে বললেও আলোচনায় আনছে না কেউই।

আমাদের দেশকে সেই আশা জাগানিয়া অর্থনীতির কাতারে আনার মূল চালিকা হলো গার্মেন্ট শিল্প। অর্থনীতিকে টিাকিয়ে রাখা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করছে। তার মধ্যে ৮০ ভাগই নারী। এই শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। কিন্তু ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে কেমন আছে এসব নারী শ্রমিক? এই রুক্ষ সময়েও যারা বাঁচিয়ে রেখেছে এ দেশের অর্থনীতিকে। কোটি টাকার প্রশ্ন হলেও এর কোনো সদুত্তর নেই!

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গেছে, খুব একটা ভালো নেই দেশের অর্থনীতির প্রাণ এসব নারী শ্রমিক। তাদের রক্ত-ঘামে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এ শিল্প থেকে দেশ যেমন আয় করছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, তেমনি শিল্প মালিকরা করছেন প্রচুর মুনাফা। মালিকেরা লক্ষপতি থেকে কোটিপতি, গাড়ি, বাড়ি, কারখানার সংখ্যা বাড়তে থাকে। অথচ তারা তাদের ব্যবসার ‘লক্ষ্মী’ শ্রমিকরা কেমন আছে; তার খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেন না।

 এদেশে এখনো নারী শ্রমিকদের মজুরী বৈষম্য প্রকট; কারখানায় দুর্ঘটনা, মজুরি বৃদ্ধিতে মালিকদের গড়িমসি অার  আবাসনের অনিশ্চয়তা কর্মক্ষেত্র হিসেবে পোশাক শিল্প নারীদের অাশা দিনের পর দিন ফিকেই হয়ে যাচ্ছে। একদিকে মালিকদের উদাসীনতা; অন্যদিকে উপার্জনক্ষম নারীদের নিজের আয়ের উপর কর্তৃত্ব করতে না পারারও বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের মানসিকতা, মূল্যবোধ নারীকে আর্থিক ও মানসিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল করে রাখছে। আর এটাই মূলত নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।

অবশ্য নারীর উপার্জিত অর্থে পুরুষের হস্তক্ষেপ লিঙ্গীয় বৈষম্যের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। যেখানে পুরুষ একজন নারীকে কখনো এককভাবে ব্যক্তি হিসেবে দেখে না। তাদের ভাবনায় থাকে পরিবারের প্রয়োজনেই নারী আয় করেন, সুতরাং পরিবারের সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব পুরুষেরই। তাই নারীর আয়ের ওপরও তাদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব থাকবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১ শীর্ষক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যেসব নারী আয় করেন; তাদের প্রায় ২৪ শতাংশেরই নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা দেখিয়েছে, গ্রামের তুলনায় শহুরে নারীদের নিজেদের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা বেশি আছে।

ওই জরিপে আরও দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ নারীরই উপার্জনের স্বাধীনতা নেই। মাত্র ১৫ শতাংশ নারী নিজের ইচ্ছায় উপার্জনের স্বাধীনতা পান। আবার যারা নারীকে উপার্জন করতে দেন, তাদের মধ্যে ৯৩.১৯ শতাংশ স্ত্রীর উপার্জন করার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেন না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যৌথ গবেষণা ‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান নিরূপণ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ এ তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের নারীরা বছরে গৃহস্থালির কাজ করে ১০ লাখ ৩১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকার, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের দেশজ মোট উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

কৃষিতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক শ্রম জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সালে দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত ২ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ছিলেন নারী। এক দশক আগেও সংখ্যাটা ছিল মাত্র ৩৮ লাখ। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন ৬৭ লাখ নারী। সে নারীরা তাদের প্রাপ্য মজুরী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরুষের মতো সমান কাজ করে তারা অর্ধেক মজুরী নিয়েই কাজ করে চলছে।

অন্যদিকে, ‘নারীর ভূমির অধিকার ও বঞ্চনা’ শীর্ষক এক গবেষণায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত দেখিয়েছেন, মানবাধিকার, ন্যয়বিচার ও ভূমির ওপর নারীর অধিকার চার শতাংশ বা কোনও-কোনও ক্ষেত্রে তারও কমে ঘুরপাক খাচ্ছে। ৯৬ শতাংশ নারীই অধিকার-বঞ্চিত হয়ে জীবনযাপন করছে। নারীর ওপর নির্যাতন যেমন বাড়ছে তেমনই মামলা করে বিচার পাওয়া নারীর সংখ্যা কমছে। বাড়ছে নানা রকমের হেনস্তা।

এতো কিছুর পরেও আমাদের শ্রম আইনের বাস্তবায়ন নেই। শ্রম আইনের ৭৯ ধারায় বলা আছে, নারীদের কোনো বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ৯৩ ও ৯৫ ধারায় বলা হয়েছে, নারী শ্রমিক ৪০ জনের বেশি আছে এমন কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের পরিচর্যার জন্য আলাদা কক্ষ ও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিশুর সংখ্যা ২৫ এর বেশি হলে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিন্ত এ আইন কোথায় মানা হচ্ছে সেটাই বড় প্রশ্ন। আইন কাগজে আছে; কিন্ত তা মানাতে বা প্রয়োগের বিষয়টি রাষ্ট্র এখনো নিশ্চিত করতে পারে নাই। অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হয়, যতো দিন রাষ্ট্র এর সমাধান দিতে পারবে না ততদিন এ সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকারের বিষয়টি কাগজ কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এভাবে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা আর বৈষম্যের শিকার হয়ে চলছে আমাদের নারী শ্রমিকেরা। কিন্তু নীরব কর্তৃপক্ষ, নীরব সরকার। নীরব পৃথিবী। এই নীরব পথ চলায় স্ফীত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিপতিদের পকেট। আর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে ধরনীকে দু’হাত ভরে দেওয়া অভাগী নারী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। এ লেখাটির ভাষারীতিও লেখকের নিজস্ব)

বিজ্ঞাপন