চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অক্টোবর: ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতার মাস

অক্টোবর মাসকে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতার মাস বলা হয় যাতে করে মানুষ এইরোগ সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এইরোগ সম্পর্কে জানে কিন্তু এর চিকিৎসা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগনির্ণয় এবং প্রতিরোধ বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানে না। এই মাসে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের এবং চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সমাজের বিভিন্ন সংগঠন সমুহকে সক্রিয় অংশগ্রহণে সম্পৃক্ত করা যায়। ভাল খবর হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এবং চিকিৎসা করলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্পূর্ণ নিরাময় হতে পারে। ম্যামোগ্রাফি নামের একটা পরীক্ষা প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ নির্নয়ে এবং চিকিৎসা করতে সাহায্য করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি আটজনে একজন এই রোগে আক্রান্ত। মহিলাদের ক্যান্সারের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রেস্ট ক্যান্সার। আমাদের দেশেও এর অবস্থান দ্বিতীয়। ১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় ব্রেস্টক্যান্সার সচেতনতা মাস এর-সূচনা হয়। অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং এস্ট্রাজেনেকা (তদানীন্তন ইম্পরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ) নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এই আন্দোলনের সূচনা করে। তখন তারা ম্যামোগ্রাফি বিষয়ে প্রচারণা শুরু করে যে এটি ক্যান্সার বিরোধী সংগ্রামে একটি বড় হাতিয়ার। ১৯৯১ সালে সুসান জিকমেন ফাউন্ডেশন ক্যান্সার সারভাইবারদের স্মরণে আয়োজিত একটি সিটি রেস-এ প্রথম ‘পিঙ্করিবন’ বিতরণ করে। এরপর ১৯৯৩ সালে এভেলিনলডার ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘পিঙ্করিবন’কে এর প্রতীক নির্ধারণ করেন। এই মাসটি উদযাপনের জন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম-এর পাশাপাশি শোভাযাত্রা, পদযাত্রা, অন্যন্যা খেলাধূলা বা বড় বড় ভবন পিঙ্ক কালারের আলোকসজ্জা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

পুরুষদেরও ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়। যদিও এর সংখ্যা খুবই কম (১%) কিন্তু তাদের জন্যও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। ২০০৯ সালে ‘পুরুষ ব্রেস্টক্যান্সার এডভোকেসি গ্রুপ’ এবং ‘ব্রান্ডন গ্রিটিং ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে অক্টোবর মাসের ৩য় সপ্তাহকে ‘পুরুষদের ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা সপ্তাহ’’ নির্ধারণ করে। যেহেতু ব্রেস্ট ক্যান্সার বা অন্যন্য ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা নাই তাই এর প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা নেয়াই সবচেয়ে ভাল উপায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এবং চিকিৎসা সম্পূর্ণ নিরাময় হতে পারে আর দেরীতে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্নয়ের জন্য কিছু বিষয়ে সকল কে সচেতন করাই এই মাসটি উদযাপনের উদ্দেশ্য।

ব্রেস্ট ক্যান্সারে মৃত্যুর হার কিন্তু অনুন্নত এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই বেশি। দেখা গেছে এই দেশসমূহে রোগ নির্ণিত হয় দেরিতে। রোগ নির্ণিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো সচেতনতার অভাব আর স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। এ-দুটি কারণই কিন্তু পরিবর্তন করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচির মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীতে কিছু কার্যক্রম চলছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রোগের লক্ষণগুলো এবং স্ক্রিনিং বা বাছাইকরণ পদ্ধতির কথাগুলো মানুষকে জানানো। স্ক্রিনিং-এর সহজ উপায় হলো চিকিৎসকের সাহায্যে পরীক্ষা করানো, আর কিছু পরীক্ষানিরিক্ষা করা যেমন ম্যামগ্রাফি করানো। পরীক্ষা করানোর বিভিন্ন সময়সূচি রয়েছে। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো করতে হবে।
এইমাসটি কিভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে? আমরা কিছু কার্যক্রম তুলে ধরতে পারি যার মাধ্যমে নারীরা প্রাথমিক পর্যায়ে এইরোগ নির্ণয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন। যেমন-

বিজ্ঞাপন

১. ডাক্তার বা নার্সগণ মহিলাদের সাথে স্ক্রিনিং বা বাছাইকরণ পদ্ধতির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন।
২. ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের ম্যামোগ্রাফি বিষয়ে উৎসাহিত করেন যে কখন এটা শুরু করতে হয়।
৩. পঞ্চাশোর্ধ মহিলাদের প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর ম্যামোপ্রাফি করার ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান করবেন।

আমাদের জানা প্রয়োজন যে ক্যান্সার প্রতিরোধের চারটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত- ব্যক্তিপর্যায়ে, ব্যক্তিমানুষের সচেতন হওয়া এবং ঝুকিপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা। দ্বিতীয়ত- সামাজিক পর্যায়, সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ঝুকিপূর্ণ বিষয়গুলো পরিহার করা। যেমন-ধূমপান বর্জন আন্দোলন। তৃতীয়ত- রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ভাবে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকারক পদার্থ সমুহের বিপণন, পরিবহন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণকরণ এবং চতুর্থ পর্যায়ে, আন্তর্জাতিকভাবে আইন কানুনের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের ব্যবসা, পারমাণবিক যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। এভাবে আমরা এক দিকে যেমন পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচতে পারি তেমনি মারাত্মক রোগ ক্যান্সারের হাত থেকেও বাঁচতে পারি।

ক্যান্সার চিকিৎসার কয়েকটি অংশ রয়েছে। এরমধ্যে সার্জারী, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোনথেরাপি এবং টারগেটেড থেরাপি প্রধান। কিন্তু এর পরের অংশটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আর তাহলো ক্যান্সারের চিকিৎসকের কাছে আজীবন ফলোআপ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদেও দেশে এই কাজটি কাউকেই ঠিকমত করতে দেখা যায় না। নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে চিকিৎসা পরবর্তীকালে ক্যান্সারের পুনরাবির্ভাব শুরুতেই নির্ণয় করা যায়, এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া যায়। ফলে একজন রোগী দীর্ঘদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারে।

দেশীয় কোম্পানিগুলোও এখন ক্যান্সারের ওষুধ সুলভ মূল্যে বাজারজাত করছে। ক্যান্সার সাপোর্টিভ কেয়ারের একটি অত্যবশ্যকীয় ওষুধ পেগফিলগ্রাসটিম এক সময় ৪০ হাজার টাকার উপর ছিল। এখন এই ওষুধ ৩ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য কেমোথেরাপির ওষুধগুলোও দেশে তৈরি হচ্ছে এবং এর মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। এতে করে রোগীরা এখন ওষুধের উচ্চমূল্যের জন্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। ওষুধের সহজলভ্যতা তৈরিতে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো বিরাট সক্ষমতা অর্জনে সমর্থ হয়েছে।

সবশেষে বলবো, আমাদের দেশে সামাজিক বহুবিধ কারণে মহিলাদের চিকিৎসা সুষ্ঠুভাবে হয় না। তাই এ-ব্যাপারে পুরূষ-মহিলা নির্বিশেষে সকলকে সচেতন হতে হবে। একমাত্র সচেতনতাই পারে মানুষকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। সুতরাং মানুষের সময়মতো সুচিকিৎসা এবং ভালো থাকার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে ঘরে ঘরে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)