বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের চাষযোগ্য জমি ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর।যেখানে বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ তিন কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের সুত্রে জানা যায়, বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে যে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাড়ছে। প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ৮,৭০০ (আট হাজার সাত শত) হেক্টর জমি। নির্মাণ কাজের কারণে প্রতি বছর বিলীন হচ্ছে ৩,০০০ (তিন হাজার) হেক্টর জমি।গত ৩৭ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে।


পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য মতে দেশে মোট ইট ভাঁটার সংখ্যা হাজার ৫১০ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশে ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির হিসেবে ইট ভাটার সংখ্যা হাজারের অধিক। মৃত্তিকা গবেষক কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৫০ হাজার একর আবাদি জমি এই ইট ভাটাগুলোর দখলে রয়েছে। প্রতিটি ইট ভাঁটায় বছরে গড়ে ৭৫ হাজার করে ইট প্রস্তুত হলে এবং ইট প্রতি গড়ে সাড়ে তিন কেজি করে মাটি ধরলে এতে প্রায় ১৫ কোটি মেট্রিক টন মাটি লাগে। এর ফলে প্রায় ১৩,৫০০(সাড়ে তেরো হাজার) হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়।


উন্নয়নের ধাক্কায় শামিল হতে বাড়ছে রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, দালান কোঠা। সে সব ক্ষেত্রেও শাবল বা কোদাল চালানো হচ্ছে কৃষি জমির ওপর গত পাঁচ বছরেও আলোর মুখ দেখেনিজাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ভূমি জোনিং আইন২০১০। তাহলে নিকট ভবিষ্যতে কী হবে আমাদের! একটু হিসেব করে দেখা যাক।

উপরের হিসেব মতো বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর হলে তা হবে আনুমানিক ১,৯৮,৪২,৫৬২ একর বা ৫,৯৫,২৭,৬৮৬ বিঘা বা ১,১৯,০৫,৫৩,৭২৮ কাঠা। আবার প্রতিবছর বাড়ি ঘর তৈরির জন্য ৩,০০০ হেক্টর আর ইট-ভাটার কারণে আবাদযোগ্য জমি নষ্ট হয় ১৩৫০০ হাজার হেক্টর জমি। তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৬,৫০০ হেক্টর জমি প্রতিবছর অনাবাদী হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে আছে প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর বা ২১,৪৯৮ একর জমি নদীর্ গর্ভে বিলীন হওয়া৷ কিছু হিসেবের ফ্যাকড়া বাদ দিলে, কম করে হলওে প্রতি বছর ২৫,২০০ হেক্টর একর জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদী জমি থেকে।


যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতি বছর % হারে আবাদী জমি হারাচ্ছি আমরা। হয়তো সেখানে ইট ভাটার জমিতে কিছু পুকুর তৈরী হয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। কিছু চরের জমিও ভাঙ্গছে নদীতে। যার অর্থ দাঁড়ায় দেশের র্বতমান উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে শিল্প কারখানা, নদী ভাঙ্গন আর বসবাসের জন্য বাড়ি ঘর তৈরী করতে আবাদযোগ্য কৃষি জমি ব্যবহারে এই হার আরো বাড়বে। না বাড়লেও আগামী (১,৯৮,৪২,৫৬২ ভাগ ৫৯,১৯৮) ৩১৮ বছর পরে আর কোন আবাদযোগ্য জমি আমাদের দেশে থাকার কথা না। আর আবাদযোগ্য জমি হারানোর হার বছরে % ধরলে ১০০ বছর পরে বাংলাদেশে আর কোন আবাদযোগ্য জমি থাকাবে না। থাকবে চর এলাকার জমি, যেটা সব ধরণের ফসলের উপযোগী না। কিছু নদীতে বা সমুদ্রতটে চর জাগবে, সেগুলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য হবে না।

এমন হলে আমরা কী করবো? আবাদযোগ্য জমি কীভাবে রক্ষা করবো আমরা! আমরা যারা বিষয়টি নিয়ে ভাবি তারা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি যে, মাটি তৈরী হতে সময় লাগে কয়েক হাজার বছর। সেই মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরী শুধু মাটিই নষ্ট করে না, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। ঢাকা শহরের পাশের ইট ভাটাগুলো ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। তার সাথে আছে নগরীর উপকণ্ঠে বা দেশ জুড়ে তৈরী হওয়া অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা থেকে বর্জ্য নির্গমণ এবং অহেতুক বেশি বড় জায়গায় বাড়ি তৈরী করার বিলাসী মানসকিতা।


সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু এই অনাগত সমস্যার কথা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বলেছিলেন গ্রামীণ শহর তৈরী করতে। তিনি তাঁর এমপিদের মধ্য থেকে এ্যাডভোকেট রহমত আলীসহ একটা দলকে ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে, তারা কীভাবে গ্রামীণ শহর তৈরী করে আবাদযোগ্য জমি রক্ষা করে।এ্যাডভোকেট রহমত আলীর দল ফিরে এসে যে রিপোর্ট দেন, তাতে যা বলা হয় সেটা অনেকটা এরকম-

প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য আলাদা আলাদা বিশাল বড় বাড়ি তৈরী করা হবে, যাকে আমরা আধুনিক শহরে কন্ডোমিনিয়াম (এক্সটেনশন) টাইপের ভবন বলে থাকি। যেখানে তাঁদের গোষ্ঠীর মানুষ বংশ পরম্পরায় থাকবেন, প্রয়োজনে কন্ডোমিনিয়ামের এক্সটনেশন করবেন। বাসা হবে অনেক খোলামেলা। কারণ মাত্র কয়েকটা বড় বাড়িতেই ঢুকে যাবে একটা বড় গ্রাম পুরোটাই। থাকবে বিনোদনের সব সুবিধা সেনিটেশনসহ বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি।স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের জন্য এসব পরিসেবা দেওয়াও সহজ হবে আবাদযোগ্য জমি বাঁচবে, বাঁচবে দেশ।


এবার আসি বর্তমান জনবহুল বাংলাদেশে। শিল্প প্রতিষ্ঠা, মাটির ইট পোড়ানো আর নদী ভাঙ্গনে চলে যাচ্ছে আমাদের দেশের বিরাট অংশের আবাদযোগ্য জমি। বঙ্গবন্ধু কন্যা ভাবলেন কী করা যায়। তাই তিনি নতুন শিল্পাঞ্চলের ধারণায় বিশ্বব্যাংক আর জাইকার সহায়তায় স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এসইজডে) এর ধারণা দিলেন। প্রায় ১০০ টারও বেশী এসইজডেএর স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে সারা দেশের চরাঞ্চলে, আবাদযোগ্য জমি যেন নষ্ট না হয় সেটা ভেবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ইট পোড়ানো বন্ধ করা। জাইকার সহায়তায় সরকার বালি আর পলিমাটি দিয়ে আগুন ছাড়াই ইট তৈরী করার গবেষণা কাজ হাতে নিয়েছে, যা এক বা দুই বছর পরেই সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি ইউরোপে আছে অনেকদিন থেকেই, তাই সেখানে মাটির ইট পড়ানো নিষিদ্ধ। চীন, জাপানেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার চালু আছে। সরকারের হাউজ বিল্ডিং গবেষণা ইন্সটিটিউট (এইচবিআরআই) জাইকার সহায়তায় এটা নিয়ে কাজ করেছে, করবে। বালি আর পলিমাটি দিয়ে তৈরী এই ইটের খরচ পড়বে মাটির ইটের চেয়ে কম, কিন্তু বেশি টেকসই, উন্নত হবে। এই ইট শুধু শহরে না, গ্রামীণ শহর তৈরীতেও ব্যবহার করা হবে মাটির ইটের ১০০% বিকল্প হিসেবে। এটা সহজলভ্য হবে খুব দ্রুত, কারণ ধরণের ইটের কারখানাগুলো তৈরী হবে নদীর তীরবর্তী এলাকায় সারা দেশজুড়ে।

তাহলে নদী ভাঙ্গন কীভাবে কমবে? আগুন ছাড়াই ইট তৈরী করার জন্য বালি আর পলিমাটি সংগ্রহে ইটের কারখানাগুলো সরকারের লোকের তদারকীতে নদী ড্রেসিং করবে। ফলে নদীর নাব্যতাও বৃদ্ধি পাবে, অনেক এলাকায় নদী ভাঙ্গন অনেকটা কমবে বলে অনুমান করা অন্যায় হবে না। যে সব এলাকায় ইটের কারখানা থাকবে না, সেখানে সরকারী উদ্যোগে ড্রেজিং হবে। ফলে এই বালি আর সমস্যা না হয়ে সম্পদে পরিণত হবে। ইউরোপে এই ইটের রপ্তানী সুযোগ অনেক বেশী। এটা হবে আরেকটি গার্মেন্টস শিল্পের মত।

এর বাইরেও আরেকটি কাজ করা লাগবে কৃষি জমিতে নিবিড় চাষ পদ্ধতি চালু করা। সেটা হবে উপরের কাজগুলো করার পর। হয়তো আর মাত্র ৫০ বছর পরেই আমাদের দেশে এটা চালু হবে বা হতে হবে। কীভাবে তাঁর বিস্তারিত না বলে বিদেশে কিছু পরীক্ষার নমুনা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মনে করুন আপনার জমি আছে মাত্র বিঘা। আপনি কৃষিকে শিল্পের আদলে নিয়ে যেতে চান। টাকা আছে আপনার অনেক। কিন্তু জমি নেই নিজের। সংশ্লিষ্ট এলাকায় কেউ জমি বেঁচবে না। আমাদের পাশের কোন কোন দেশেই এমন গবেষণায় অনেক সাফল্য এসেছে। মনে করি জমি বিঘা বা ৪৩,২০০ র্বগফুট। সেখানে তার উপর বহূতল ভবন তৈরী করা। প্রতি ফ্লোরের ওয়াল থাকে কাঁচের বিশেষ কাগজ লাগানো যা দিয়ে তাপ সুপরিবাহী বা কুপরিবাহী করা যায়। কাঁচগুলো হয় আমাদের গাড়ীর জানালা বা সামনের গ্লাসের মতো কেউ আঘাত দিলেও টুকরা টুকরা হয় না। ফ্লোরের মাটি পরিশুদ্ধ করে সেখানে প্রয়োজনীয় অর্গানিক সার দিয়ে অর্গানিক সব ধরনের ফসল ফলানো যায়। ইচ্ছা করলে কৃত্তিম মাটি ব্যবহার করে হাইব্রিড নানা ফসল ফলানো যায়। সেখানে থাকে না রোগ বালাইয়ের ভয়, না থাকে উৎপাদন ঘাটতি। কৃষিতে আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো গবেষণা আর এক্সটেনশনের মাঝে বিরাট ফারাক। গবেষণায় কোন ফসলের যে ফলন দেখানো হয় মাঠে কৃষকরা তা পান না যথাপোযুক্ত ফার্ম ম্যানেজমেন্টের অভাবে। তাই এই পদ্ধতির চাষে এই ফারাক থাকবে না, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে ফলন বেশি হতে পারে। এর দেখা দেখি গ্রামের কিছু বংশের লোক এই নিবিড় কৃষিতে এগিয়ে আসবেন আস্তে আস্তে যখন তাঁদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়বে বা সমবায় পদ্ধতিতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন।

আমাদের জীবন এখন বেলা শেষের গান শুনছে। তবুও চুপ থাকতে পারি না। ভাবছি আমাদের নাতি-পুতিদের জন্য। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসের সুযোগ না করে দিয়ে গেলে, ওরা একদিন আমাদের কবরের উপর লাঠির বাড়ি দিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করলেও করতে পারে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)