রোহিঙ্গাদের উপর ‘জাতিগত নিধন’ চালানোর বিষয়টি গোপন করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন অভিযান সংক্রান্ত পোস্ট, ভিডিও, এমনকি লেখাগুলোও পড়ছে সেন্সরের কবলে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্রুপ দ্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’কে (আরসা) ‘বিপদজনক সংস্থা’ অ্যাখ্যা দিয়েছে ফেসবুক। এই গ্রুপের বা এর প্রশংসাসূচক কনটেন্টগুলোও মুছে দিতে মডারেটরদের নির্দেশ দিয়েছে তারা।

সমালোচকরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে ফেসবুক আসলে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ওপরই সেন্সর আরোপ করেছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ আনওয়ারের মতে, এর মাধ্যমে ফেসবুক মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিধন চলছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের পর ফেসবুক আরসা’র বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়। মিয়ানমার সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছে ফেসবুক।

অ্যাক্টিভিস্টদের অভিযোগ, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর বর্বর ও নিষ্ঠুর অভিযান সংক্রান্ত পোস্ট সেন্সর করছে ফেসবুক। এমন অভিযোগের কিছু পরেই আরসাকে ‘বিপদজনক সংস্থা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কথা জানায় ফেসবুকের মুখপাত্র।

ফেসবুকের ওই মুখপাত্র জানান, সন্ত্রাস, পরিকল্পিত সহিংসতা বা অপরাধ, গণহত্যা বা বিদ্বেষ ছড়ানোয় নিয়োজিত এই ধরনের সংস্থার (আরসা) কোন পোস্ট বা তাদের সমর্থনসূচক পোস্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অন্য যে পক্ষটির কারণে চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে নিজ বাড়িঘর ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফেসবুক। এই পক্ষটিকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা বা তাদের কোনও পোস্ট মুছে দিতে রাজি নয় ফেসবুক।

মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি’র মুখপাত্র জো তেই ফেসুবকের এই সিদ্ধান্তের স্বাগত জানিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে আরাকান আর্মি বিষয়ক ফেসবুকের একটি বার্তা শেয়ার করেছেন তিনি।

২৬ আগস্টের ওই পোস্টে জো আরাকান আর্মি’র পক্ষে যায় এমন যে কোনও পোস্ট নিষিদ্ধ করতে বার্মিজদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার ওই পোস্ট প্রায় সাত হাজার বার শেয়ার হয়েছে।

আয়ারল্যান্ডভিত্তিক রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ রফিক বলেন, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হত্যাযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার পর গত ২৮ আগস্ট তার অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

“আমি এখনও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ছবি ও ভিডিও পাচ্ছি। তবে আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, এমন শঙ্কায় সেগুলো ফেসবুকে পোস্ট করছি না।”

ফেসবুকের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ সংক্রান্ত পোস্ট মুছে দেওয়ার বিষয়টি প্রথম সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেন মোহাম্মদ আনওয়ার। তার অভিযোগের ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডেইলি বিস্ট।

এতে এমন বহু সংখ্যক স্ক্রিনশট উঠে আসে যেখানে কথিত নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্ট মুছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি শুধু টেক্সট রয়েছে এমন পোস্টও মুছে দেওয়া হচ্ছে।

কুয়ালালামপুরভিত্তিক সাংবাদিক মোহাম্মদ আনওয়ার রোহিঙ্গা ব্লগার ডটকম নামের একটি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, রাখাইনের ৪৫ জন সংবাদকর্মীর একটি টিম তার পোর্টালের জন্য কাজ করছে।

ফেসবুকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ আনওয়ার-এর পোস্টগুলো ভুল করে মুছে দেওয়া হয়েছে। তবে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ সংক্রান্ত পোস্টের ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ অব্যাহত রয়েছে।

এর আগেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার একটি ছবি সেন্সর করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলো ফেসবুক। বিখ্যাত সেই ছবিটি নাপাম বোমা হামলা থেকে পলায়নরত এক নগ্ন বালিকার।

এ ঘটনার পরে গত বছরের অক্টোবরে সহিংসতা ও নগ্নতা বিষয়ক কনটেন্ট নিষিদ্ধ করার নীতিমালায় কিছুটা পরিবর্তন আনে সামাজিক মাধ্যমটি। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয়, জনস্বার্থের ক্ষেত্রে সংবাদ মূল্য, তাৎপর্য বা গুরুত্ব বিবেচনায় ছবি অনুমোদন করবে তারা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সেই নীতিমালা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ।