মিরাজ গোটা দশেক স্কয়ারকাট করলেন। সবগুলো দেখার মতো। শুরুর ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে আগেই মিরাজের কথা টানার কারণ, এদিন দারুণ লড়াইয়ে ফিফটি তুলে নিয়েছেন তিনি। টপঅর্ডার যেখানে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে তরুণ ব্যাটসম্যানের এই ব্যাটিং তো আলাদা বার্তা বহন করবেই। সেই বার্তা সাহসের। সেই বার্তা দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের। আর ফলোঅন এড়ানোর স্বপ্ন জিইয়ে রাখার। যে স্বপ্নের পথে হাঁটতে হাঁটতে মিরাজকে নিয়ে দলীয় সংগ্রহটা ৩২২ রানে টেনে তৃতীয়দিন শেষ করেছেন মুশফিক। ফলোঅন এড়াতে এখনো দরকার দেড়শতাধিক রান।

অশ্বিন শেষ বিকেলে প্রায়ই বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন। মিরাজ-মুশফিকের সামনে শনিবার অবশ্য সেটা হতে পারলেন না। মিরাজকে দেখা গেল বারবার ফ্রন্টফুটে ডিফেন্স করতে। কখনো এক পা সামনে এসে। এসব নিশ্চয়ই পরিকল্পনারই অংশ।

অশ্বিনের বল পিচ করে ঘুরতে দিলে বিপদ। সে কথা মাথায় রেখে তরুণ সতীর্থকে নিয়ে মুশফিকও সামনে এসে বারবার ব্লক করে গেলেন। জায়গা বানিয়ে কয়েকটি কাট করেছেন। সেগুলোও নিখুঁত ছিল।

দিনটি আরো ভালো হতে পারতো। সাকিবের পুরনো রোগ ফিরে না আসলে। ৮২ রান করার পথে সাহসী সব শট খেলেছেন। কোহলির আগ্রাসী ফিল্ড পজিশনের সামনে যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ব্যাট হাতে ভারত কাপ্তান ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েই বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে অর্ধেক ছিটকে দেন। ফিল্ডিংয়ে নেমে আক্রমণাত্মক ছকে আবার বাংলাদেশকে চেপে ধরেন। শুরু থেকে তিন স্লিপ। শর্টকাভার। শর্ট-মিডঅফ। শর্ট-পয়েন্ট। যাদব-ইশান্তকে আক্রমণে রেখে রিয়াদ-মুমিনুলকে ঘিরে ধরেন। আরেক প্রান্ত থেকে জাদেজাকে দিয়ে শর্টলেগ আর লেগ স্লিপে দুজনকে রেখে বল করান।

রিয়াদরা এমন ফ্রেমের সামনে খাবি খেলেন। সাকিব এসে কোহলিকে বাধ্য করেন ফিল্ডিং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে। দিনশেষে তাই সাকিবের ‘ডাউন দ্য উইকেটে’ এসে শট খেলা সমালোচিত হলেও ক্রিকেটের মৌলিক জ্ঞানে এই ইনিংসটির দাম অনেকখানি। তার ছড়িয়ে দেয়া সাহসের রেণু বুকে নিয়েই তো মিরাজ ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক তুললেন।

ভারত গতকাল ৬৮৭ রানে নিজেদের প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সৌম্য সরকারের উইকেট হারিয়ে ৪১ রানে দিন শেষ করেছিল। শনিবার সকলেই তাকিয়ে ছিল তামিমের ব্যাটের দিকে। কিন্তু রা আউটে সে স্বপ্নের সমাধি রচিত হয়। দুই রান নিতে যেয়ে মুমিনুল তখন মাঝপথে থেমে যান। তামিমও ততক্ষণে ক্রিজ ছাড়া। দুজনে আবার ছুটলেও তামিমের দেরি হয়ে যায়। ফেরার আগে ৫৩ বলে ২৫ রান তার।

পরে মুমিনুলও বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। যাদবের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে সাজঘরের পথ ধরেন। যাওয়ার আগে করতে পারেন ১২। এরপর ধুঁকতে থাকা রিয়াদ (২৮) ইশান্ত’র বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন।

অধিনায়ক মুশফিকের উইকেটকিপিং ক্ষমতা নিয়ে দুদিন ধরে তুমুল আলোচনা চলছে। ব্যাট হাতে জবাব দিয়ে সেই আলোচনার স্রোত থামানোর একটা চেষ্টা হয়তো ছিল তার। তাতে আপাতত সফলই বলা যাবে অধিনায়ককে। ঝলমলে ৮১ রানে অপরাজিত থেকেছেন তিনি। সঙ্গী মিরাজের নামের পাশে ৫১ রান।

শেষবেলায় ব্যক্তিগত ৭৭ রানে থাকার সময় বুক কাঁপানো ছবি সামনে নিয়ে আসেন মুশফিক। ইশান্ত’র বাউন্সরে ডিফেন্স করতে যেয়ে আঙুলে বল লাগান। নিউজিল্যান্ড সিরিজের স্মৃতিময় ভয় ফিরে আসতে যাচ্ছিল। তখন কাঁদতে হয়েছিল তাকে। খেলতে পারেননি এক টেস্টে। এদিনও ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেন। তবে পরিশ্রমী শরীরটা নিয়ে শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়ান। ফলোঅন এড়ানোর সংকল্পের সামনে শক্ত বলটার আঘাতকে তুচ্ছজ্ঞানই করেছেন। গুরু দায়িত্ব যার কাঁধে, তাকে তো জাগতিক ব্যথা ভুলতে হবেই!