ইন্টারনেট আর মুঠোফোনের এই যুগে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের চালানো ‘জাতিগত নিধন’-এর কথা এখন বিশ্বের প্রায় সব মানুষই জানে। এ কারণে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি বিশ্ব জনমত তৈরি হওয়ার কারণে বেশ চাপে আছে মিয়ানমার। গুটিকয়েক দেশ ছাড়া জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রায় সকল সংস্থা এবং দেশ মিয়ানমারকে নিজেদের নৃশংসতা বন্ধের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য অহরহ চাপ দিচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্টেনিও গুতেরেস শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ সরব। এ বিষয়ে অনেকবার কথা বলেছেন তিনি। প্রতিবার তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে এ বিষয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদী হলে এই অঞ্চলে চরমপন্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে তার আশঙ্কা। আর এখানে চরমপন্থা ও উগ্রবাদ শক্তিশালী হলে তা যে বিশ্ব পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে না, এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

জাতিসংঘ-রোহিঙ্গা সংকট-মিয়ানমারআন্টেনিও গুতেরেসের মতো বিশ্বনেতার এই আশঙ্কা কোনভাবেই অমূলক নয়। রোহিঙ্গাদের এখন নতুন করে আর কিছু হারানোর নেই। তাদের বাড়িঘর, জমিজমা আর আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে যা হারানোর তা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে হারিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে যারা পালিয়ে আসতে পেরেছে, তাদের এখন ‘বোনাস লাইফ’। এই সুযোগে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তাদের খুব সহজেই টার্গেটে পরিণত করতে পারে। আর এর পরিণাম কতোটা ভয়াবহ হতে পারে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব পদে থেকে আন্টেনিও গুতেরেসের ধারণার বাইরে থাকার কথা নয়। এ কারণেই তিনি বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্য দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে অবিরাম চাপের মুখে থাকা মিয়ানমার অবশেষে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজেদের সুর নরম করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে অং সান সু চির দপ্তরের একজন মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা এগিয়ে নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দলের মিয়ানমার সফর আশার আলো জ্বালিয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার বরাবরই এই ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে হতাশ করেছে। বিভিন্ন সময়ে তারা ছলচাতুরি আর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নিচু মনমানসিকতা আর অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আর আন্তর্জাতিক চাপে শেষ পর্যন্ত তারা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে বলে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ধূর্ততার আশ্রয় এখানেও। মিয়ানমার সরকার বলছে: ১৯৯৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী তারা প্রতিদিন ৩শ’ জন করে রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেবে। আইওএম-এর ভাষ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ সপ্তাহে রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর থেকে নতুন করে ৮ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আর আগে থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করে আসছে। সেই হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। এখন মিয়ানমার যদি প্রতিদিন মাত্র ৩শ’ জন করে রোহিঙ্গা ফেরত নেয়, তাহলে সকল রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে এক যুগেরও বেশি সময় লাগবে! মাত্র দুই মাসে আট লাখের বেশি মানুষকে ঘরছাড়া করে নিজ ঘরে ফেরাতে যুগ পার করে দেয়ার মানসিকতা নিতান্তই কৌতুক ছাড়া আর কিছু নয়।

তবে আসিয়ান সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেত্রী অং সান সু চির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করবে মিয়ানমার। ওই সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর চলা সহিংসতার বিষয়টি উত্থাপন করে বিশেষভাবে নজরে আনে দুই সদস্যরাষ্ট্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে অং সান সু চির পক্ষে জানানো হয়, কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তার সরকার কাজ শুরু করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো- আসিয়ান সম্মেলনে চাপের মুখে পড়ে মিয়ানমার বারো বছরের বদলে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করার পর এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কেমন কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে? সু চির এই অঙ্গীকারের উপর ভিত্তি করে কেন এখনও রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে না? বাংলাদেশ যদিও আসিয়ানের সদস্য নয়, তবুও অধিবেশনের বাইরে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বৈঠকে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। মিয়ানমারের ধূর্ততার বিষয়ে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোকে বোঝাতে তারা এ বিষয়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে কথা বলার মতো অবস্থান মিয়ানমারের না থাকলেও এবার গোয়েবলসীয় কায়দায় তাদের ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরণের নির্যাতনের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বর্মী জেনারেলরা দাবি করছেন, তারা কোনো রোহিঙ্গাকে ধর্ষণ বা হত্যা করেনি, তাদের গ্রাম পুড়িয়ে বাড়িঘরে লুটপাট চালায়নি। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে চালানো অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে এই দাবি করা হয়। অবশ্য এর আগে রাখাইন রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মং মং সোয়েকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

রোহিঙ্গা-মিয়ানমার-মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

এছাড়া মিয়ানমারের এই দাবি যে ডাহা মিথ্যা তার আরও একটি উদাহরণ দেয়া যায়। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি জোনাথন হেড সহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে কঠোর প্রহরায় রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রাম দেখাতে নিয়ে যায় বর্মী সেনাবাহিনী। সেখান থেকে ফিরে ‘হু ইজ বার্নিং ডাউন রোহিঙ্গা ভিলেজেস?’ শিরোনামে করা জোনাথন হেডের ‘দুঃসাহসী’ রিপোর্টে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ওই রিপোর্টে দেখা যায়, সরকার সমর্থক কয়েকজন ব্যক্তি সশস্ত্র পুলিশের সামনেই রোহিঙ্গাদের একটি গ্রামে আগুন লাগিয়ে লুটপাট করছে। সেনাবাহিনীর অসতর্কতায় হুট করে সাংবাদিক দলটি দেখে ফেলে। পরে জোনাথন হেডের জিজ্ঞাসায় তাদের একজন স্বীকারও করে সে স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর। রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত এমন চ্যালেঞ্জিং রিপোর্ট তেমন একটা নেই বললেই চলে। আর মিয়ানমার সরকার যেখানে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত করছে, সেখানে সেনা প্রহরায় থেকেও এমন প্রতিবেদন বের করে আনতে পারাটা খুবই ‘দুঃসাহসী’ কাজ।

জোনাথন হেডের এই রিপোর্টের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী কোনভাবেই এটা বলতে পারে না যে, ‘১. সেনাবাহিনী নিরীহ গ্রামবাসীর দিকে গুলি ছোঁড়েনি, ২. নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়নি, ৩. গ্রামবাসীদের গ্রেপ্তার, মারধর বা হত্যা করেনি, ৪. গ্রামবাসীদের সোনা-রূপা, যানবাহন বা গবাদিপশু চুরি করেনি, ৫. মসজিদে আগুন দেয়নি, ৬. গ্রামবাসীদের হুমকি-ধমকি দেয়নি এবং তাদের গ্রামছাড়া করেনি এবং ৭. ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়নি।’

এর আগে মিয়ানমার অভিযোগ করেছিল বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্যই দেরি হচ্ছে! এমনকি রোহিঙ্গাদের জন্য প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্যই বাংলাদেশের এই ধীরগতি বলেও অভিযোগ করেছেন সু চির ওই মুখপাত্র। আসলে সু চির ওই মুখপাত্র এখনও ১৯৭০ কিংবা আশির দশকেই আছেন। তিনি হয়তো জানেন না বাংলাদেশ এখন আর আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়াও চলতে পারে। তার দেশ রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছে, সেই প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে এখনও বহন করে চলছে এই বাংলাদেশ। এ কারণে আধুনিক যুগে মিয়ানমার যেখানে বর্বরতার প্রতীক, বাংলাদেশ সেখানে মানবিকতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এছাড়া তাদের এসব নাগরিকের কারণে বাংলাদেশ উল্টো খাদ্য সংকটে পড়বে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করে আসছেন।

মূল কথা হলো- বাংলাদেশকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার উস্কানি দিয়েও যখন কোনভাবেই রোহিঙ্গা ইস্যু ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা যায়নি, তখন মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে মিয়ানমার। তাই সেই উস্কানি মোকাবেলার মতোই মিয়ানমারের এই মিথ্যাচার দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সুকৌশলে মোকাবেলা করে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারকে চাপে রাখতে না পারলে তারা যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে না, মিয়ানমার সফরের পর দেশে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাদের চাপে রাখতে প্রয়োজনীয় তৎপরতা এখনও খুব অপ্রতুল বলেই মনে হচ্ছে। এমন ঢিলেঢালা কূটনৈতিক তৎপরতা কখনোই সংকট সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না। সময় থাকতে এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। কারণ, কথায় আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’

( বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইএর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)