তাঁর গল্পের বিষয়, গদ্য আর ভাবনার বিচিত্র মিশেলে পাঠকের মধ্যে একধরণের ঘোর তৈরি করে। নব্বই দশকের শক্তিশালী গল্পকার মাহবুব রেজা বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের দিগন্তকে বহুবৈচিত্রে বর্ণিল করে তুলেছেন। এই লেখকের গল্প পাঠকদের মর্মে পৌঁছে যায় তার একান্ত নিজস্ব মুন্সিয়ানায়।

আজ তার জন্মদিন। তিনি ১৯৬৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। চ্যানেল আই অনলাইনের পক্ষ থেকে এই পরিশ্রমী গল্পকারের জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা।

বাংলা শিশুসাহিত্যের বয়স প্রায় তিনশ বছর। এই দীর্ঘসময়ের যাত্রায় এসেছে নানা পরিবর্তন ও বাঁকবদল। জন্মলগ্নে উপদেশ আর মুখস্ত বুলির সম্ভার ছিলো শিশু-কিশোর সাহিত্য। বিশেষভাবে সত্তর ও আশির দশকের শেষভাগ পর্যন্ত আমাদের শিশু-কিশোর গল্পে মোটামুটি গতানুগতিক ধারা ছিল যেখানে কিছু শেখানো বুলি, গরীব ধনীর বৈষম্য, বাবা-মায়ের মিল অমিল সহ নানা ধরণের আখ্যান ছিল। কিন্তু নব্বই দশকে শিশুসাহিত্যে বড় পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে যে ক-জন শিশুসাহিত্যিকের সক্রিয় অবদান রয়েছে, তাঁদের মধ্যে মাহবুব রেজা অন্যতম। শুধু পৃষ্ঠার পরে পৃষ্ঠা নয়, বরং স্বকীয়তা বজায় রেখে শিশু-কিশোরদের মননে ছাপ ফেলবে, এমন লেখা লিখে সেই নব্বই দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত লিখে চলেছেন শিশু-কিশোর সাহিত্যের মূল ধারার লেখক মাহবুব রেজা।

মাহবুব রেজা প্রচলিত গতানুগতিক একঘেঁয়ে শিশুসাহিত্যের কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে সাথে রচনাভঙ্গি, এমনকি গল্পের উপাদানেও আনলেন বিস্তর পরিবর্তন। এই ভিন্নধারার দুঃসাহসী গল্পকার আরো কয়েকজন থাকলেও মাহবুব রেজা তখনকার শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের ছোটদের পাতায় প্রচুর পরিমানে গল্প উপন্যাস লিখে ঈর্ষণীয় অবস্থান তৈরী করেছেন। ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসর, দৈনিক বাংলার সাত ভাই চম্পা, দৈনিক সংবাদের খেলাঘর, দৈনিক খবরের চাঁদের হাঁট, মাসিক শিশু, মাসিক নবারুনসহ আরো পত্রিকায়। এখনো জাতীয় দৈনিকগুলোর শিশুদের সাহিত্যপাতা ও সাহিত্যের কাগজগুলিতে জ্বলজ্বল করে মাহবুব রেজার শিশু-কিশোর গল্প ও উপন্যাস।

১৯৬৯ সালে নভেম্বরে জন্মগ্রহণ করেছেন এই শক্তিমান পাঠকপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক মাহবুব রেজা। শৈশব থেকেই দেখেছেন জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলো। ছেলেবেলাতেই বাবাকে হারিয়ে এই কঠিন শহরে বড় হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে এই কঠিন বাস্তবতা ও জীবনাভিজ্ঞতার নিকট হার না মেনে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর গল্পে তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার আলোকে আমাদের দেখা না দেখো চারপাশ ঝলমল করে ওঠে। গল্পে যেমন মধ্যবিত্ত দুঃখকষ্টকে, যাতনাকে এই লেখক নিজের মতো করে দেখেছেন যেখানে ফুটে উঠেছে জীবনের গল্প, এক জীবনের দীর্ঘশ্বাস। এই বিষ্ময়কর অভিজ্ঞতা ও আখ্যান শিশু-কিশোরদের বোধের জন্ম দেয়, জন্ম দেয় গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে একটু ভাবতে, কিংবা নতুন আঙ্গিকে জীবনকে দেখতে।

মাহবুব রেজা বাজারে ধরণের লেখা লেখেন না। এই দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা মাত্র তিয়াত্তর। তাঁর সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় তিনি কম লিখেন। তবে যেটুকু লিখেন, সেটুকুর মাঝে লুকিয়ে থাকে হাজারো গল্পের হাতছানি। শিশু-কিশোরদের মন-মনন-মানসিকতায় প্রভাব ফেলবে এবং তাদের নতুন ভাবে বস্তুনিষ্ঠতার সাথে চিন্তা করতে শেখাবে, এমন রচনা তিনি লিখে চলছেন অবিরত।

মাহবুব রেজার লেখার্ উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ইতিহাসকে গল্পের আলোকে উপস্থাপনের মাধ্যমে শিশু কিশোরদের নতুন দৃষ্টি উন্মোচনের প্রয়াস পাওয়া যায়। সমকালীন অনেক শিশুসাহিত্যিকই ইতিহাস নির্ভর সাহিত্য রচনা করে থাকেন। তেব তাদের অধিকাংশ রচনা শুধু ইতিহাস হয়ে থাকে, তা আর সাহিত্য হয়ে ওঠে না। আর কেউ কেউ সাহি্যিমান মেশানোর চেষ্টা করে বৈকি। তখন সেটা আরোপিত সাহিত্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সাহিত্যে ইতিহাসের নান্দনিক সম্মেলন দেখা যায় মাহবুব রেজার গল্পে। তিনি আরোপিত ইতিহাস নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন না, বরং হৃদয়ে ধারণকৃত ইতিহাস সাহিত্যের অঙ্গনে নিয়ে আসেন। আর তিনি ইতিহাস ধারণ করেন বলেই তা আর নিছক ইতিহাস হয়ে থাকে না, বরং জীবনের অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’ বইয়ের সবগুলো গল্পই ইতিহাস নির্ভর। শিশু-কিশোরদের হজমযোগ্য ও বোধগম্য করে তিনি বাংলাদেমের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য নায়কদের কথা একের পর এক গল্পে তুলে এনেছেন। বইটির প্রথম গল্প ‘রাসেলের বাবা’। এই গল্পে সন্তান রাসেলের দৃষ্টিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এঁকেছেন। এখানে তাঁকে রাজনৈতিক কবি হিসেবে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। আবার বিষয়টি পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলার জন্য পরের গল্প ‘এই গল্পটা বঙ্গবন্ধুর’-তে স্পষ্টভাবেই সেটা উল্লেখ করেছেন। এভাবেই পুরো বইতে গল্পে গল্পে সাহিত্য-মান বজায় রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মহান মুক্তিযদ্ধের নায়কদের বিরত্বগাঁথা প্রকাশ করেছেন।

মাহবুব রেজা গল্পের মধ্যে নবচেতনা জন্মের প্রয়াস দেখিয়েছেন। শিশুদের অন্ধঅনুকরণপ্রিয়তা নয়, বরং সত্যনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন করে শিশু-কিশোরদের ভাবনার জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁর গল্প পড়ার পর প্রতিটি শিশু, প্রতিটি কিশোর গল্পের একেকটি অংশ হয়ে যায়। নিজেকে সেই গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে নিজের ভূমিকার কথা চিন্তা করতে পারে। এভাবেই তিনি পাঠককে সক্রিয় করে তোলেন।
তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ফুঁটিয়ে তোলেন। ধর্ম-বর্ণ-সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল টপকে সত্যকে আঁকড়ে ধরার যে প্রবণতা, সেটা তিনি শিশু-কিশোরদের মাঝে সঞ্চারিত করেন। ফলে শৈশব ও কৈশর থেকেই সত্যানুসন্ধ্যানী হয়ে ওঠে মাহবুব রেজার খুদে পাঠকেরা। এভাবেই তিনি পরিণত বোধের গল্প লিখেন, গল্প আঁকেন।

ড. স্যামুয়েল জনসনের একটি মন্তব্যের সাথে মাহবুব রেজার প্রাসঙ্গিকতা দেখানো যায়। শেক্সপিয়র সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ড. জনসন প্রবন্ধের শুরুতে লিখেছেন, আমরা জীবিতদের দূর্বল লেখা দিয়ে মূল্যায়ন করি আর মৃতদের মূল্যায়ণ করি তাদের সেরা লেখা দিয়ে। এমনই জীবিত অথচ তুলনামূলক কম মূল্যায়িত, অথচ মূল ধারার লেখক হলেন মাহবুব রেজা। তবে তাঁর সম্পর্কে দুই বাংলার প্রখ্যাত উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি চিঠিতে লিখেছেন, “তোমার লেখার হাত আছে, আশা করি একদিন বড় লেখক হবে।” তার ভবিষ্যদ্বাণী আজ প্রত্র-পল্লব আর ফুল-ফলে শোভিত হয়ে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক মাহবুব রেজা সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, “মাহবুব রেজার গল্পগুলো সাদামাটা। কিন্তু এগুলোতে রয়েছে আন্তরিকতা, অনুভূতির গভীরতা, মানবীয় মূল্যবোধ, রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে আনন্দের একাত্ম হওয়া।” তিনি জীবনকে নতুন জানালা দিয়ে দেখতে শেখান পাঠককে। শিশুসাহিত্যিক মাহবুব রেজা শুধু গল্প লেখেন না, বরং তিনি জীবন লেখেন।
পরিশেষে, সফল জীবন আঁকিয়ে ও শক্তিমান সাহিত্যিক মাহবুব রেজা শক্তিশালী রচনার মাধ্যমে শিশুকিশোর সাহিত্যের মূল ধারায় নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি এই শিশুসাহিত্যের শুধু একজন লেখক নন, বরং বাঁকপরিবর্তনকারী পথিকও বটে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)