কথা ছিল এ মাসের ২৪ তারিখেই হবে তার বিয়ে। সে অনুযায়ী চলছিল প্রস্তুতিও। শুরু হয়েছিল বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিয়ের কার্ড পৌঁছানো। বিয়ে বলে কথা, তাই পছন্দের সব জিনিস কেনাকাটা শুরু হয় ব্যাপক উদ্যোমে।

বর আর কনের দুই পরিবারের এমন উৎসবমুখর পরিবেশ হঠাৎই ছেয়ে যায় কালো মেঘে। আকস্মিক বজ্রপাতে সেই মেঘ নামিয়ে আনে শোকের বৃষ্টি। এ দুই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের চোখ চিরদিনের জন্য ভিজিয়ে দেয় সেই বৃষ্টি।

একটি দুর্ঘটনা ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় একই সুতোয় গাঁথতে যাওয়া দুটি মানুষের হাজারো স্বপ্নকে।

দিনটি ছিল গত ১২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সকালে ঢাকা থেকে কর্মস্থল টাঙ্গাইলের সখীপুরে যাওয়ার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর ব্যাংক কর্মকর্তা আসিফ মাহমুদ শোভন। মাত্র দিন কয়েক পরই শেরওয়ানি আর পাগড়ি মাথায় দিয়ে কনের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল যার। সেই তাকেই ফিরতে হলো প্রাণহীন দেহ নিয়ে। উৎসবের সুর ভরে গেল শোকের মাতমে।

ওইদিন সকাল সোয়া সাতটার দিকে ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে শোভন মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হন সখীপুরের উদ্দেশে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে তার বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি। শোভনকে পিষে দিয়ে ঘাতক ট্রাকের চালক আর অপেক্ষা করেনি। দ্রুতই পালিয়ে যায়। তাই এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। কোন লাভ নেই জেনে, পরিবারের পক্ষ থেকেও করা হয়নি কোন মামলা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের ৩৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শোভন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সখীপুর (টাঙ্গাইল) শাখায় ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার হিসেবে যোগ দেন গেল বছরের জানুয়ারিতে। তার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে বাবা-মা থাকতেন ঢাকার শেওড়াপাড়ায় তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাটে। কিন্তু ‘বড় আদুরে সন্তান’ শোভনকে দেখাশোনার জন্য সন্তানের কর্মস্থল সখীপুরেই বাসা ভাড়া নিয়ে ছেলের সঙ্গেই থাকতেন তারা। সপ্তাহান্তে ঢাকায় আসতেন। এক দুই দিন থেকে নিজেদের ফ্লাটে তালা দিয়ে আবার সন্তানের সঙ্গেই ফিরে যেতেন সখীপুরে।

গত বৃহস্পতিবার একটি অফিশিয়াল ট্রেনিংয়ে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন শোভন। বিয়ের আগে সব অফিশিয়াল কাজ ঠিকঠাক শেষ করতে তাই সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে। কিন্তু সেই যাওয়াই যে তার ‘শেষযাত্রা’ হবে একথা ভাবতে পারেননি কেউই।

মঙ্গলবার বিকেলে শেওড়াপাড়ার ৫৬৫/১ নম্বর বাড়ির মুল ফটকের সামনে গিয়ে ‘এটা শোভনদের বাসা কিনা’ জিজ্ঞাসা করতেই দারোয়ানের মুখটি গম্ভীর হয়ে যায়। চ্যানেল আই অনলাইনের পরিচয় দিয়ে ভেতরে যেতেই দেখা গেলো ছয় জন মাদ্রাসা ছাত্র গভীর মনোযোগে পবিত্র কোরআন থেকে তেলোয়াত করছেন। বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মোঃ নয়ন চৌধুরী জানালেন, ‘মৃত শোভনের আত্মার শান্তি কামনায় এ কোরআনখানির আয়োজন।’

শোভন সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘‘এত শিক্ষিত এবং উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু তার মাঝে কখনও সেরকম কোন অহংকার দেখিনি। আমাদের সঙ্গে খুবই ভালো আচরণ করতেন সবসময়।’’

নয়নের সহায়তায় অনুমতি নিয়ে শোভনদের ফ্লাটের ২-বি’র সামনে গিয়ে জুতোর সারি দেখে বুঝতে কষ্ট হলো না, শোভনের বৃদ্ধ বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন তার আত্মীয়-স্বজনের। দরজা খুললেন শোভনের বড়ভাই রাশেদুল মামুন মিল্টন। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পড়া ষাটোর্ধ্ব একজন মানুষ বিমর্ষ হয়ে বসে আছেন ড্রয়িং রুমের সোফায়। চোখের নিচে কালো দাগ, মুখটা ভিষণ শুকনো।

মামুন পরিচয় করিয়ে দিলেন ইনিই তাদের বাবা।

“কী জানতে চান বলেন? আমাদের আর বলার কিছুই নাই। যা হারিয়েছি এর পরে আর বলার কিইবা থাকতে পারে।”

পরিচয় পেয়ে এভাবেই আপন মনে কথা বলছিলেন শোভনের বাবা সরকারের নিরীক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আখতার হামিদ।

‘’২৪ তারিখেই ছেলেটির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এই দেখেন সেই কার্ড’’ বলতে বলতে সোফার পাশে রাখা বিয়ের কার্ডের বান্ডিলের দিকে নির্দেশ করলেন। সেখান থেকে একটি কার্ড বের করতে করতে হঠাৎ করেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পিতাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁদে উঠলেন শোভনের বড়ভাই মিল্টনও। কিছুক্ষণের জন্য সৃষ্টি হলো এক শোকাবহ পরিবেশের।

পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য সামলে উঠে মিল্টন বলছিলেন, ‘‘আমার ভাই খুব ভালো ক্রিকেট খেলতো। ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলের খেলোয়াড় ছিল। কিন্তু পড়াশোনায় ও এতই ভালো ছিল যে আমরা চেয়েছি ও পড়াশোনা করেই একটা কিছু করুক। পড়াশুনায় এত ভালো না হলে হয়তো ওকে ক্রিকেটারই বানাতাম।’’

বাড়ির তত্ত্বাবধায় নয়ন তখন ড্রয়িং রুমের শোকেজ থেকে বেড় করে দেখালেন শোভনের ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচের’ দুটি ট্রফি। যেগুলো তার অতি সাম্প্রতিককালের অর্জন।

মিল্টন জানালেন, শেরে বাংলা নগর গভঃ বয়েজ স্কুল থেকে ২০০৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় খুবই ভালো ফল করার পরই মূলত ওকে ক্রিকেট থেকে সরিয়ে আনি। ভর্তি করিয়ে দেই ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে ওর সুযোগ হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

নিজের ছোটভাইকে তিনি কতটা আদর করতেন তা নিজের মুখে না বললেও, তত্ত্বাবধায়ক নয়ন জানালেন ‘মিল্টন ভাই, শোভন ভাইকে খুবই আদর করতেন। একমাত্র ছোটভাইয়ের সমস্ত কিছু তিনি দেখাশোনা করতেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক মিল্টন থাকেন চট্টগ্রামে তার কর্মস্থলেই। তাদের একমাত্র বোন ঢাকা ব্যাংকে কর্মরত।

মিল্টন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় কেবল একজন মানুষের মৃত্যু হয়নি, মৃত্যু হয়েছে দুটি পরিবারের স্বপ্নের।’

পরিবারের ছোট সন্তানের এই চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়ার মত নয়। বাসাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার নানা স্মৃতি। দুর্ঘটনার তার সঙ্গে থাকা ভেঙ্গে যাওয়া মোবাইল ফোন এবং ছিড়ে যাওয়া ব্যাগও তাই রেখে দিয়েছেন পরমযত্নে।

গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলায় হলেও তিন সন্তানকেই উচ্চ শিক্ষিত করে গড়ে তোলা আখতার হামিদ এবং তার স্ত্রী আফরোজা খানমের স্বপ্ন ছিল সন্তানদের নিয়েই ঢাকাতেই স্থায়ী হওয়া। সে জন্যই ২০০৯ সালের আগস্টে শেওড়াপাড়ার এ ফ্ল্যাটটি কেনেন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আফরোজা খানম। কিন্তু শেষ বয়সে তাকে একা করে দিয়ে সন্তানকে কেড়ে নিলো ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনা।

শোভনের শোকাতুর বাবা ছোট গাড়ি ও বড় গাড়ির জন্য আলাদা লেনের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমি যা হারিয়েছে তা তো আর কোন মূল্যেই ফেরত পাব না। শুধু সরকারের কাছে আবেদন, যেন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়। যেন আমার মত আর কোন বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়।’

শোভনের প্রকৌশলী ভাই অবশ্য দুষলেন চালকদের। তার মতে চালকেরা সচেতন হলে দুর্ঘটনা কমবে অনেকাংশে।