সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাসহ পাঁচ নির্বাচন কমিশনার শপথ নিয়েছেন। বুধবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে তাদেরকে শপথ পড়িয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। শপথ নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেন, ‘নিরপেক্ষ থেকে সব দলের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করে যাব। সরকারকে কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ দেব না।’ এই কথা জেনেও নতুন নির্বাচন কমিশনকে ইতোমধ্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশনকে স্বাগত জানালেও বিএনপি এই কমিশনের বিরুদ্ধে বিষোদাগার শুরু করেছে।

বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আওয়ামী লীগের লোক ও দলটির সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে মিষ্টিমুখ করিয়েছেন। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগের লোক। তাই তার আশংকা, নতুন সিইসি’র নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে না।

মির্জা ফখরুল রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ভদ্র রাজনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচিত। শুধু তার দল বিএনপি নয়, অন্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যারা তাকে চেনেন, তারাও তাকে এই উপাধি দিয়ে থাকেন। তার যে অভিযোগ, এটাকে বিরোধীপক্ষের মতামত প্রকাশের রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু মির্জা ফখরুলকে ছাড়িয়ে গেছেন তারই দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এই রিজভী নির্বাচন কমিশনকে নির্লজ্জভাবে আক্রমণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনারদের মনোনয়নের পর থেকেই তাদের সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কথা বলছেন তিনি। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ‘ব্যক্তিত্বহীন’ বলেও দাবী করেছেন! নির্বাচন কমিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করার আগেই সিইসিকে ‘ব্যক্তিত্বহীন’ বলে আখ্যায়িত করাটা কেমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের কাজ? অবশ্য নির্বাচন কমিশন শপথ নেয়ার আগেই দলটির আরেক নেতা নজরুল ইসলাম খান বলে রেখেছিলেন, সিইসি হিসেবে তিনি শপথ নিলে অপমানিত হবেন। এখন রিজভীসহ দলটির অন্যান্য নেতাদের কথা শুনলে মনে হয়, তারা নতুন সিইসিকে বিতর্কিত এবং অপমানিত করতে পূর্বপরিকল্পনা মতো ইচ্ছাকৃতভাবে এসব কথা বলে যাচ্ছেন। তবে তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই রিজভীদের মতো দুয়েকজন রাজনীতিককে দেখা যায় যারা রাজনীতির মাঠে সবসময় বিভিন্ন ইস্যু জিইয়ে রাখতে লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করে থাকে।

সিইসি’র প্রতি বিএনপির ভয়ের অবশ্য আরও একটি কারণ আছে। এখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার খান মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে ২০০১ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল তারা। তার বিরুদ্ধে বিএনপি তখন অভিযোগ এনেছিল, তিনি ঢাকায় চলা বিএনপি বিরোধী জনতার মঞ্চের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমনকি কুমিল্লায় তার অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি নামিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরই এই অভিযোগটি অস্বীকার করে আসছেন। তিনি এখনও দাবি করছেন, কখনোই জনতার মঞ্চের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আর অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামানোর ঘটনার সময় ওই রাতে তিনি অফিসে ছিলেন না। রাতের বেলা অবশ্য তার অফিসে থাকার কথাও না। তাই এটাকে তিনি ষড়যন্ত্র হিসেবেই দাবি করে আসছেন।

এখন বিএনপি’র ভয় হলো, প্রধান নির্বাচন কমিশনার যদি তার সঙ্গে হওয়া ‘অন্যায়ের’ বদলা বিএনপি’র ওপর নেন? তার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলে যদি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বিএনপিকে হারিয়ে দেন? তিনি যেমন চাকরি হারিয়ে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রী ও সবশেষে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, এখন যদি ঠিক সেভাবে বিএনপিকেও ক্ষমতার বাইরে রেখে একইভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরান? তাই মির্জা ফখরুল তার সহজাত প্রবৃত্তির কারণে ওইভাবে বলতে না পারায় রিজভী ও নজরুল ইসলাম খানদের দিয়ে বিএনপি বিষয়গুলো বলাচ্ছে। এতে আখেরে ক্ষতি কিন্তু বিএনপি ছাড়া অন্য কারো হবে না।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরই কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, আমি আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পেয়েছিলাম। তাই আমি পেছনের দিকে তাকাতে চাই না। কারও প্রতি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে আমার ওপর অর্পিত সাংগঠনিক দায়িত্ব আমি নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে পালন করতে চাই। সরকার বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেব না। সিইসি’র এমন অঙ্গীকারের পরেও তাকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে না দিয়ে কোন নৈতিক অধিকারে বিএনপি তাকে ব্যক্তিগত আক্রমন করে?

ফাইল ছবি

সবশেষ নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের উদাহরণে আমরা আশা করবো, সরকার নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা না করে এখন থেকেই সঠিক প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনোযোগী হবে। একইসঙ্গে বিএনপি’র উচিৎ হবে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে সঠিক পথে চলতে সহযোগিতা করা। সব পক্ষেরই উচিৎ হবে, শুধু শুধু নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত না করে নির্বিঘ্নে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেওয়া। তাই রিজভীদের মুখের লাগাম টেনে ধরাটাই বিএনপি’র জন্য এখন হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)