এমন একটি সময় ছিল একুশে গ্রন্থমেলায় নজরুল মঞ্চে পাঠকদের আনাগোনা লেগেই থাকতো। তখন লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের ভিড় যেন নজরুল মঞ্চ থেকে শুরু হতো। বর্তমানে শুধুমাত্র বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ছাড়া নজরুল মঞ্চে তেমন কোনো ভিড় দেখা যায় না।

এজন্য একরাশ হতাশা নিয়ে লেখক ও গল্পকার রেজা ঘটক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন ‘বাংলা একাডেমি’র নজরুল মঞ্চ এখন শূন্য ভিটা’।

তিনি ওই স্ট্যাটাসে লিখেছেন: গতকাল অমর একুশে বইমেলায় ঘণ্টাখানেক ছিলাম, তাই বইমেলার ডায়েরি আর লিখিনি। একটা জিনিস খুব খারাপ লেগেছে, সেটা না লিখে পারছি না। বাংলা একাডেমি এবার একাডেমি’র নজরুল মঞ্চ থেকে ‘মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ’ সরিয়ে উদ্যানের যে জায়গাটি পছন্দ করেছে, এটা আমার একদম পছন্দ হয়নি। নজরুল মঞ্চে এখন মশা আর মাছির ভিড়। ওখানে কাকের হাগুতে ভরপুর। একাডেমি ওটা পরিস্কার করার মত দায়িত্বটুকু পর্যন্ত পালন করেনি। নজরুল মঞ্চকে শূন্য ভিটা বানিয়ে বাংলা সাহিত্যের অমর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলমাকেই বরং অপমান করেছে স্বয়ং বাংলা একাডেমি।

এবারের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ পছন্দ না হবার কারণ কী? গতকাল আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, তাই বলব এখন। মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের পাশে যে সকল প্রকাশনার স্টল পড়েছে, তারা যে কী পরিমাণ শব্দ-সন্ত্রাসের শিকার, তা ওইখানে না গেলে কেউ বুঝতে পারবেন না। আমি আমার এক বন্ধু’র বই দেখার জন্য শব্দশৈলীতে গিয়েছিলাম। ঠিক তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাননীয় সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের দিকে যাচ্ছিলেন। একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করার জন্য।

সেই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছে এটা বইমেলার পরিবেশ দারুণভাবে নষ্ট করেছে। কাদের ভাই আমার খুব প্রিয়। আমার মত কাদের ভাইয়ের অনেক ভক্ত আছেন। সেই ভক্তরা যেভাবে কাদের ভাইয়ের পেছনে যাচ্ছিলেন, তাদের কাছে ওটা বইমেলা ছিল না। তারা কে কত বেশি কাদের ভাইয়ের লোক, তাই দেখাতে তারা স্রেফ বইমেলার বিষয়টাই ভুলে গিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, একটা মারদাঙ্গা মিছিল যাচ্ছে। বইমেলার মাঠে এমন অনেক মিছিল আমি গত কয়েক বছর ধরে দেখছি। যা বইমেলার জন্য চরমভাবে অপমানজনক। অথচ মাত্র দুই দিন আগে আমি ‘ভক্ত পরিবেষ্টিত ছাড়াই’ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে বইমেলায় প্রবেশের সময় দেখেছি। নাহিদ ভাই আর আমি কথা বলতে বলতে বইমেলায় একাডেমি অংশে ঢুকেছিলাম। সেখানে তেমন কোনো মিছিল কিন্তু ছিল না।

বুঝলাম, কাদের ভাই’র ভক্ত সংখ্যা বেশি। তাই বলে বইমেলার পরিবেশ নষ্ট করে এমন কিছু করা কী ঠিক? আমি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য একাডেমি’র ভেতরে কোনো মিলনায়তনকে স্থায়ীভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাব করছি। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান একাডেমির কোন মিলনায়তনে হলে সেখানে বরং সকল ভক্তদের বেশ ভালো বসার ব্যবস্থা একাডেমি করতে পারবে। একাডেমি সেজন্য বইপ্রতি মিনিমাম এক হাজার টাকা করে নিক। তবুও আমাদের শব্দ-সন্ত্রাসের হাত থেকে বাঁচাক। বাংলা একাডেমি’র উচিত মোড়ক উন্মোচন মঞ্চটা একাডেমির কোনো মিলনায়তনে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া।

অন্তত শব্দ দূষণ থেকে সবাইকে বাঁচানোর জন্য। কারণ এবারের ওই মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের কাছে যাদের স্টল পড়েছে, তাদের শরীরে কান নামক কোনো ইন্দ্রীয় যদি বইমেলা শেষ বেঁচে থাকে, তা কেবল ডাক্তারগণ বলতে পারবে! আমি নিশ্চিত বাসায় গিয়ে এরা সবাই কানের ব্যথায় ভোগেন।

এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমি অংশে প্রবেশ করলে সেখানে কেমন ‘প্রাণটা নেই’ এমন একটা ইমেজ কাজ করছে! বাংলা একাডেমি’ কী এসব বিষয়ে নজরদারি করে না? এসব কী একাডেমির কারো চোখে পড়ে না? তাহলে এমন বইমেলার আয়োজক সেজে কী লাভ? ক্ষমতা দেখানো আর ক্ষমতা শো করায় বাঙালির চিরায়ত এই যে বেলাল্লাপনা, এটা শেষপর্যন্ত অমর একুশে বইমেলাকেও গ্রাস করেছে দেখে, আমি খুব হতাশ! তবুও প্রাণের বইমেলায় মনের টানে যাই। কিন্তু অনেক কিছু দেখে মাথাটা নষ্ট হয়ে যায়!

সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। সবার আগে বাংলা একাডেমির শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি। বই কিনুন। প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। অমর একুশে বইমেলা নিরাপদ ও সফল হোক। জয় বাংলা।