প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের বাইরে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষকে দেশের আর্থিকখাতের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে মোবাইল ব্যাংকিং। তবে এ খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এখনো বিশাল জনগোষ্ঠী এই সেবার বাইরেই রয়ে গেছে। নতুন এই সেবা মাধ্যমে দেশে প্রতিদিন বিপুল অর্থ লেনদেনের যে তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচার করে, বাস্তবে ততোটা নয় বলে দাবি করছে মোবাইলের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম ‘বিকাশ’।

প্রতিদিনের মোবাইল লেনদেনের যে বিপুল অর্থের পরিসংখ্যান কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলে ধরছে বাস্তব চিত্র তার চেয়ে ভিন্ন বলেই মনে করেন বিকাশের প্রধান নির্বাহী কামাল এস. কাদির।

এ বিষয়ে তার বক্তব্য, ‘‘আমাদের লেনদেন নিয়ে একটা ভুল তথ্য দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে টাকা দেয়া এবং টাকা তোলা মিলিয়ে মোট লেনদেন ধরা হচ্ছে। আমরা যে ৬’শ-৭’শ কোটি টাকা শুনছি এটা বাস্তবে এতো নয়। বড়জোর এটা ২’শ কোটি টাকা হতে পারে।’’

অর্থ লেনদেনের এই সেবাটি মোবাইল অপারেটর নাকি সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর হাতে থাকবে তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। বিকাশ, রকেট এসব সেবাদাতাদের মধ্যে নেই কোনো আন্তসম্পর্ক। তাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় গ্রাহকদের লেনদেন কেবল বিকাশ থেকে বিকাশ কিংবা রকেট থেকে রকেটেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখতে এবং অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্যমুক্ত রেখে ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার বিষয়ে জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) দ্বিতীয় বার্ষিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের এসব বিষয়ে কথা বলেন তারা। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত সম্মেলনের বিষয়বস্তু ‘সামাজিক অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রবৃদ্ধির ব্যবস্থাপনা’।

দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বা সাধারণের সম্পৃক্ততায় দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর আর্থিক সেবাখাত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন বক্তারা।

সরকার এবং সেবাদাতা পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন আছে জানিয়ে মোবাইল লেনদেন সার্ভিস বিকাশের প্রধান নির্বাহী কামাল এস. কাদির বলেন, ‘অগ্রসরমান মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রযুক্তি, জনগণের অন্তর্ভুক্তিসহ সব ত্রুটি দূর করতে হলে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে।’

কামাল এস.কাদির, সিইও, বিকাশ

প্রযুক্তিকে শুধু মাধ্যম হিসেবে নিয়ে সেবা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আর্থিকখাতে অতিনিয়ন্ত্রণ কিংবা একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীনতার বদলে ভারসাম্য বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘‘প্রযুক্তি হচ্ছে আদান-প্রদানের মাধ্যম। অর্থনৈতিকখাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সেবার মান বাড়াতে হবে, সেবাকে সুলভ করতে হবে। আর আর্থিকখাত সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ।’’

তবে নতুন চ্যালেঞ্জ, সীমাবদ্ধতার পরও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জনসাধারণকে দেশের আর্থিকখাতের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে বলে আশা করেন আলোচকরা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) কৌশলগত উপদেষ্টা অনির চৌধুরী বলেন, ‘এখন একটি বাড়ি-একটি খামারের মতো সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পে মোবাইল ব্যাংকিং নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। কারণ এই সেবায় লেনদেন সময় ও খরচ কম এবং জনগণের জন্য সরকারি সেবাও সহজলভ্য হচ্ছে।’

আর্থিকখাতে সত্যিকার জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পরামর্শ, প্রশ্নোত্তর সেশন দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের সানেম সম্মেলন।