হঠাৎ করেই আপনি একদিন দেখলেন রাজধানীর রাস্তায় কোনো যানজট নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় বসে না থেকে অল্প সময়েই আপনি পৌঁছে গেছেন নিজের গন্তব্যে। কিংবা দেখলেন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ফুটপাতে হাঁটছেন আপনি।

হ্যাঁ, এভাবেই আগামী দিনে রাজধানী ঢাকাকে দেখতে চান একজন অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যার্নাসের সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ।

তার বক্তব্য, প্রযুক্তি ব্যবহার করে নগরীর বিদ্যামান অবকাঠামোকে আরো কার্যকরভাবে মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী করে তোলা সম্ভব। আর এর মধ্যমেই ঢাকাকে রূপান্তর করা যাবে স্মার্ট সিটিতে।

এ জন্য, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, সুশাসন ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা ও ফুটপাথকে মানুষের চলাচলের উপযোগী করে তুলতে হবে। এসব ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসতে হবে পুরোপুরি প্রযুক্তির আওতায়।

মঙ্গলবার রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে ‘বিজনেস কনসেপচুয়েলাইজেশন অব স্মার্ট সিটিজ:স্মার্ট সল্যুশনস টু আর্বান ইনফ্রাসট্রাকচার অ্যান্ড ট্রাফিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এভাবেই স্মার্ট সিটি হিসেবে তুলে ধরা হয় আগামীর ঢাকাকে।

শহরকে দক্ষ সেবাভিত্তিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করতে ব্যবসায়িদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও জার্মানী সংগঠন ফ্রেডরিখ ন্যুম্যান ফাউন্ডেশন (এফএনএফ) এই বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি বন্টন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রাইভেটখাতকে যুক্ত করা হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব। এবং সেগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির অধীনে নিয়ে আসতে হবে।

রাজধানীতে জনস্রোত দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, ঢাকায় বর্তমানে প্রতি বর্গমাইলে এক লাখ ১৪ হাজার জন মানুষ বসবাস করে। যেখানে প্রতিবেশি দেশ ভারতের মুম্বাইতে প্রতি বর্গমাইলে ৮৩ হাজার ৮শ ও নিউইয়র্কে মাত্র ৪ হাজার ৬শ জন মানুষ বাস করে।

শহরকে স্মার্ট করতে করণীয়:
শহরকে স্মার্ট করতে অধ্যাপক আকতার তার প্রবন্ধে কয়েকটি প্রস্তাবনা দেন। এতে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহনের ব্যবহার বর্তমানের চেয়ে আরো ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়াতে হবে, কম দূরত্বের পথে বাইসাইকেলে বা হেঁটে যেন যাওয়া সে বিষয়ে সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শহরের এসব পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি এমনকি জনগণকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

তবে প্রবন্ধে পরিবহণ খাতে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে আকতার মাহমুদ বলেন, পরিবহণ খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। অর্থাৎ শহরে জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সুশাসন ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা ও শব্দ দূষণ রোধ ও পানি সরবরাহের সমস্যা দূর করতে হবে। এসব ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু পরিচালনা ও তদারকির জন্য পুরো সিষ্টেমকে প্রযুক্তির আওতায় খাতভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। এতে পরিচালনা সহজ ও নিয়মমাফিক হবে। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ভূমিকা নিতে তথ্য প্রযুক্তি খাতকে।

এছাড়া রাস্তায় যানজট কমাতে ও চলাচলে সময় কমিয়ে আনতে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালি, ঢাকা থেকে আশুলিয়া, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা থেকে সিলেট, ঢাকা থেকে মাওয়া ও ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ে চালু করার প্রস্তাব দেন এই অধ্যাপক।

বৈঠকে এফবিসিসিআইর প্রথম সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, কিভাবে ঢাকাকে উন্নত দেশগুলোর মতো স্মার্ট করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব নিয়ে এফবিসিসিআইর সঙ্গে আলোচনা করছে। সেগুলোর বাস্তবতা, কার্যকারিতা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে।

তিনি বলেন, শহরে বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহারকে কিভাবে আরো কার‌্যকর যায় সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে প্রযুক্তির আওতায় এনে বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতি উদঘাটন করা যাবে বলে আশাকরি।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে জার্মানীভিত্তিক সংগঠন ফ্রেডরিক ন্যুম্যান ফাউন্ডেশনের (এফএনএফ) বাংলাদেশ প্রতিনিধি নাজমুল হোসেন, এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি মো. মুনতাকিম আশরাফ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটি, ঢাকা ওয়াসা ও সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা স্মার্ট সিটি বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।