“আমার একটা চাকরি ব্যবস্থা করে দেন। কিছু লাগবে না, দুই বেলা খাবার, চা-বিড়ি আর একরুমের একটা বাসা ভাড়ার খরচটা দিলেই হবে। আর কিছু চাই না আমি।” এমন অসহায় আকুতি নিয়ে তিনি প্রায়ই আমাকে ফোন করতেন। কিন্তু আরেক অসহায় এই আমি তাঁর জন্য কিছুই করতে না পারার অক্ষেপ নিয়ে একে ওকে অনুরোধ করতাম। যাদের কাছে চাকরি আছে, তাদের নম্বরটা দিয়ে বলতাম, এর সাথে একটু যোগাযোগ করে দেখেন, তৈয়ব ভাই। পরে শুনেছি সাবেক অনেক সহকর্মীকে ফোন করে এমন করেই নিজে অসহায়ত্বের কথা জানাতেন তিনি।

৮ নভেম্বর মর্মান্তিক এক খবরে থমকে গেলাম। আমার খুব কাছের এক ছোট ভাই ফোন করে জানালো তৈয়ব ভাই মারা গেছেন। কষ্টের এক নীলস্রোত ঢেউ তুলে সমস্ত শরীরকে স্থির করে দিল; যখন জানলাম মৃত্যুর তিন মাস আগে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক আর অচল মানুষে পরিণত হওয়া সাংবাদিক তৈয়বুর রহমান আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। রংপুরের গ্রামের বাড়িতেই তার শরীরে আগুন লেগেছিল বলে তার স্বজনরা জানান। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

বলছি সেই সাংবাদিক তৈয়বুর রহমানের কথা। যিনি ভালোবেসেছিলেন সাংবাদিকতাকে। দেশের জন্য কিছু করবেন বলে কাস্টমস-এর লোভনীয় চাকরি ছেড়ে এসেছিলেন সাংবাদিকতায়। তাঁর সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়া ব্যক্তিদের চাকরি অভাব ছিল না। রক্তে যার সাংবাদিকতার নেশা, তাঁকে চাকরির বাঁধনে বাঁধা যাবে না এটাইতো স্বাভাবিক ঘটনা।

সাংবাদিকতার প্রতি অকৃত্রিম সেই ভালোবাসা থেকে দৈনিক আজাদ দিয়ে শুরু হয়েছিল পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তৈয়বুর রহমানের যাত্রা। তারপর একে একে কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক মানবকণ্ঠ, দৈনিক বর্তমান,  অনলাইন নিউজপোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, রাইজিংবিডিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

তার সঙ্গে আমার পরিচয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ, ২০০৬ সালে, একজন  সহকর্মী হিসেবে। সেই সময় মালিকানা বদলে নতুন রূপে যাত্রা শুরু করেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। পালাবদলের সেই ক্ষণে নতুন অনেকের সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন তৈয়বুর রহমান। সেই সময় দৈনিক অাজকের কাগজ থেকে রিপোর্টার হিসেবে সেখানে যোগ দিয়েছিলাম। আর তৈয়ব ভাই এসেছিলেন দৈনিক জনকণ্ঠ থেকে, উপ-বার্তা সম্পাদক হিসেবে।

তার কাছাকাছিই বসতাম আমি। হয়তো উত্তরবঙ্গের মানুষ বলেই তাকেই একটু বেশি কাছে টেনেছিলাম; কিংবা তিনি টেনেছিলেন আমাকে। দিনে দিনে সেই সম্পর্ক আরো কাছের করে নেয়, আপন করে নেয় আমাকে। অ্যাসাইনমেন্টের কাজে সারাদিন বাইরে থেকে বিকাল বা সন্ধ্যায় যখন অফিসে পৌঁছে নিজের কাজ শেষ করে তাঁর কাছে যেতাম,  তখন এক রকম দাবি নিয়েই বলতেন, পিসি (বিডিনিউজে আমার নামের সংক্ষেপ) এই নিউজটা একটু দেখে দেন প্লিজ। আমি আগ্রহ নিয়েই সেই কাজ করতাম। এক সময় লক্ষ্য করলাম তৈয়ব ভাইয়ের দেয়া কাজগুলো আমার ভালো লাগছে। রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি দিনের পর দিন আমি আনন্দ নিয়েই তাঁর কাজগুলো করে দিয়েছি।

এভাবে কয়েক বছর চলার পর আমি উপলব্ধি করতে পারি; তিনি আসলে আমার অগোচরেই আমার ভেতরে থাকা অন্য এক ‘আমি’কে দিনের পর দিন তৈরি করে গেছেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্যই ছিল সেই আমাকে গড়ে তোলা। আজ আমি বুঝতে পারি আসলে তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, আমাকে তৈরি করার কারিগর। তিনি শুধু আমাকেই হাতেকলমে শেখাননি। আমার আরো কয়েকজন সহকর্মীও এই শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করেছেন। যাদের কেউ কেউ সাংবাদিকতায় এমন প্রিয় শিক্ষকের করুণ পরিণতিতে ডু্করে ডুকরে কেঁদেছেন। শেষ জীবনে তাঁকে সহায়তা করতে না পেরে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন।

কিন্তু সেই তৈয়বুর রহমানকে এই দেশ, এই সাংবাদিকতা কি দিল? যিনি সাংবাদিকতার পেছনে ছুটে সব রকম লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের জীবনকে শুধু বিলিয়েই দিয়ে গেলেন। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের মনে করে যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো অকাতরে দান করে গেলেন-সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই বা তাঁর জন্য কি করেছে? শেষ জীবনে অসহায় এই মানুষটি যখন চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন, তখন ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি তাঁর অধীনে কাজ করে আজ যারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের উচ্চপদে আসীন; সুযোগ থাকার পরও তৈয়বুর রহমানের জন্য তারাও কিছু করেননি।

আমরা হয়তো অনেকেই এমন বহু তৈয়বুর রহমানের মতো সাংবাদিকদের কথা জানি। যারা শুধু এদেশের সাংবাদিকতাকে দিয়েই গেছেন। বিনিময়ে নেননি কিছুই কিংবা পাননি। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে; যখনই প্রতিষ্ঠান জেনে ফেলেছে-এর কাছ থেকে পাওয়ার আর কিছুই নেই, তখন তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ একটা বয়স পেরিয়ে গেলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই সাংবাদিকদের বোঝা ভাবতে শুরু করে। নানা অজুহাত খুঁজতে থাকে তাঁকে বিদায় বলে দিতে।

আমার প্রশ্ন এক যুগ আগেও কি দেশের গণমাধ্যমগুলো তার কর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণ করতো? অনেক সিনিয়র সাংবাদিকের মুখে শুনেছি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের আলাদা করে দেখতো না। নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবেই একজন সাংবাদিকের বিপদে পাশে দাঁড়াতো। এমনকি কাজ করতে কোনো সাংবাদিক অক্ষম হলেও মাসের পর মাস বেতন দিয়ে যাওয়ার নজিরও সেই প্রতিষ্ঠান রেখে গেছে। সেই সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাংবাদিকদের বন্ধনটা ছিল আত্মিক, বিবেকের। তখন বেতন কম থাকলেও দুইপক্ষের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল। সেই বোধ থেকে কেউ কখনো নিজেকে অসহায় মনে করেনি।

সেই জায়গা থেকে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে; আজ কোথায় দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো? কোন অনিশ্চিয়তায় মধ্যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এদেশের গণমাধ্যম কর্মীরা? তাদের জন্য কি কারো কোনো দায় নেই? পেশার জন্য তারুণ্য বিলিয়ে দেয়া সেইসব সাংবাদিকদের পরিণতি কি তৈয়বুর রহমানদের মতোই হবে?

পাশাপাশি অারেকটি প্রশ্ন চলে আসে; এই সাংবাদিকদের জন্য কি রাষ্ট্রের কোনো দায় নেই? ঢাকঢোল পিটিয়ে সাংবাদিকদের কল্যাণের নাম করে ২০১৪ সালের শেষের দিকে যে ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আইন’ করা হলো তার সুবিধাভোগী কারা? এই ট্রাস্ট গঠনের পর গত বছর ‘দুস্থ সাংবাদিক’ হিসেবে ১৯৬ জনের হাতে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত মোট এক কোটি ২০ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান তুলে দেয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি সেখানে তৈয়বুর রহমানের মতো সাংবাদিকদের জায়গা হয়নি। অনুদান পাওয়াদের অর্ধেকেরও বেশি সমাজে সচ্ছল হিসেবে পরিচিত বলে একাধিক গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে।

শুধু তাই নয়, কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে সেইসব ‘দুস্থ সাংবাদিকের’ তালিকা করে তথ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ আছে, সরকার সমর্থিত সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে যে তালিকা পাঠানো হয় তাদের নামেই অনুদানের অনুমোদন করে মন্ত্রণালয়। এমন কি আবেদন না করেও সেই তালিকায় কোনো কোনো সাংবাদিকের নাম থাকতেও আমরা দেখেছি।

মোটা দাগে বলা যায়, তৈয়বুর রহমানদের মতো সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ধারণ করে না, তেমনিভাবে তাদেরকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয় রাষ্ট্রও। শেষ পর্যন্ত তাদের কারো জীবনের ইতিঘটে আগুনে পুড়ে, কেউ গাড়ির নিচে পড়ে, কেউ আবার চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে। আমি নিশ্চিত এখনো তৈয়বুর রহমানের মতো সাংবাদিক যারা রয়েছেন; তাঁদের পরিণতিও তাই হবে। পরিচিত অার ঘনিষ্ঠ  দু’একজন কয়েকদিন ইস, আহারে, অহ্ ইত্যাদি শব্দ করে জীবনের অনিবার্য ব্যস্ততায় আবার সব ভুলে যাবে। তারপর কেউ আর কোনো দিন স্মরণ করবে না তাঁদের কথা, তাঁদের অবদান। এসব ভুলে নিজেদের পাপমোচনে পালিয়ে বেড়াবো আমরা। জীবন গাড়ির শেষযাত্রায় হয়তো চিৎকার করে বলবো; ক্ষমা করবেন তৈয়ব ভাই। তারপর স্তব্ধ হয়ে যাবে সবকিছু।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)