ষষ্ঠ ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিনের ৩০টি সেশনে সাংবাদিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাহিত্য ও মানবের যাপিত জীবনের অনন্য সম্মিলন ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ সকাল থেকেই মেতে উঠেছিল শিল্পী- সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের পদচারণায়। ছিলেন শিল্পবোদ্ধা, সাহিত্যপ্রেমীদের আড্ডা প্রতিটি আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহণ এক অন্য বাংলাদেশ উঠে এসেছে।

লিট ফেস্টের প্রথম দিনে উদ্বোধনের পর ২৩টি ভিন্নধর্মী আলোচনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বইয়ের গল্প, স্মৃতিচারণসহ নানা আয়োজ়নে জমে উঠে উৎসব।

বেলা ১১টায় বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য মিলনায়তন তথা প্রধান মঞ্চে এই আয়োজনের উদ্বোধন করেন নোবেল জয়ী লেখক ভিএস নাইপল ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্‌ ও আহসান আকবর।

নোবেল জয়ী ব্রিটিশ সাহিত্যিক ভি এস নাইপল স্টেজে এসে ফিতা কেটে ঢাকা লিট ফিস্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই সংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নির্দেশনায় রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে সুরের ধারা। এরপর শুরু হয় মূল পর্বের অনুষ্ঠান। শুরুতেই বক্তব্য রাখেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক যথাক্রমে কাজী আনিস আহমেদ, আহসান আকবর ও সাদাফ সায্‌। কাজী আনিস আহমেদ ধন্যবাদ জানান বিদেশি অতিথি ও উপস্থিত সকলকে। পাশাপাশি লিট ফেস্টের আকর্ষণগুলো তুলে ধরেন তিনি।lit-fest3

আহসান আকবর তার বক্তৃতায় আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাহিত্যকে তুলে ধরতে এই উৎসবের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। উৎসব পরিচালকদের মধ্যে সর্বশেষ বক্তৃতা দেন সাদাফ সায্‌। একই সঙ্গে উৎসবের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করা সাদাফ তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের দুই হাজার বছরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে উৎসবটিতে সেসব ঐতিহ্যবাহী লোকসাহিত্যের গানগুলোকে স্থান করে দেওয়ার কথা জানান।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর কথা উল্লেখ করেন। উদ্বোধনের পরপরই শুরু হয় অন্যান্য আলোচনা সেশন।

বেলা ১টায় মূল মঞ্চে বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে ‘ওয়ার্ল্ড ফিকশন:  হিডেন রিয়েলিটি’ শীর্ষক আলোচনায় বসবেন ড্যানিয়েল হান, নিকোলাস, লেজার্ড ও আনজুম হাসান ও নায়েল এলতোখি। সাহিত্য শীর্ষক এই আলোচনায় সাহিত্যের ভাষান্তর নিয়ে কথা ওঠে। ভাষান্তরের এই বিষয়টিকে শুধু অনুবাদ বা বৈশ্বিক সাহিত্যের দৃষ্টিকোন থেকে দেখবেন সেই নিয়েই তর্ক করেন আলোচকরা।

এদিকে ২ হাজার বছরের পুরনো এক শহর। নাম হোমস। ৫/৬ বছর আগেও সে শহরে মানুষ জাগতো স্বাভাবিকতার স্বাদ মুখে নিয়ে। সে শহর এখন শ্বশ্মান। অন্নপূর্ণা আর আদিল- স্বপ্নালু এক যুগল। জন্মসূত্রে পা্ওয়া ধর্মে তারা আলাদা। প্রতিকূল পরিবার আর তৃতীয় বিশ্বের হাজারও দুঃসংবাদের ভিড়ে একটু সুসংসবাদ হয়ে ওঠার আশায় পাড়ি জমায় সিরিয়ায়, হোমসে। হাজার মাইল দূরের অপরিচিত শহর হোমসের ট্রাজেডি অন্নপূর্ণার নিজের জীবনরে ট্রাজেডি অন্নপূর্ণার জীবনের ট্রাজেডি হয়ে ওঠে।এই নিয়েই ভালোবাসার শহরের গল্প। ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর এই ছবি নিয়ে গল্প করেন সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায় ও জয়া আহসান।lit-fest1

এ সময় আরেক মঞ্চে চলছিল ‘ইমাজিনিং হিস্ট্রি’। আলোচনায় অংশ নেন তিন স্বনামধন্য সাহিত্যিক- সাজিয়া ওমর, বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী এবং সাদ হোসেন। কেকে টি স্টেজে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন সাদ হোসেন।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফখরুল আলম অনুদিত বিষাদসিন্ধু নিয়ে অয়ালোচনায় অংশ নেন স্বয়ং অনুবাদক ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং ইএমকে সেন্টারের পরিচালক এম কে আরেফ। ফখরুল আলম জানান পুথিভিত্তিক এই সাহিত্য কর্মটি অনুবাদ করতে তার তিন বছর সময় লেগেছে।

আমেরিকার কবিতা ও আমেরিকা নিয়ে মঞ্চে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ করেছেন পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন কবি বিজয়ী সেশাদ্রি, চীনা মার্কিন কবি জেফরি ইয়াং বাংলাদেশি কবি ও অধ্যাপক কায়সার হক। তিন কবি অবশ্য কবিতার চেয়ে সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।

সাম্প্রদায়িকতার এপার-ওপার নিয়ে মঞ্চে বসেছিলেন দুই বাংলার সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকরা। আহমেদ রেজার সঞ্চালনায় এই সেশনে ছিলেন, জহরসেন মজুমদার, সেমন্তি ঘোষ, মাসুদুল হক, মাসুদুজ্জামান। বক্তারা বলেন সাম্প্রদায়িকতার কোনও বিভেদ নেই।

ইমাজিনিং হিস্ট্রি’শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন তিন স্বনামধন্য সাহিত্যিক- সাজিয়া ওমর, বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী এবং সাদ হোসেন। সাহিত্যে কল্পনার উপস্থিতি নিয়ে এ আলোচনায় বক্তারা সাহিত্য ও ইতিহাসের মিশ্রণ নিয়ে আলোচনা করেন। ইতিহাসের নায়ক ও শহীদদের স্বীকৃতি নিয়ে আলোকপাত করা হয় এ আলোচনায়। সাজিয়া ওমর বলেন, ‘আমাদের সাহিত্যে ইতিহাসের নায়কদের আরও বেশি উপস্থিত থাকা উচিত। যাতে করে আমাদের শিক্ষার্থীরা এদের ব্যাপারে আরও জানতে আগ্রহী হয়।’
সাহিত্য, স্থাপত্যবিদ্যা এবং স্নায়ুবিজ্ঞান। কলা আর বিজ্ঞানের চিরকালের মন কষাকষি তো আছেই, বিষয়বস্তু থেকেও যে এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অথচ বৃহস্পতিবার, ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিনে এই তিন শাস্ত্রের মধ্যেই কি চমৎকার মেলবন্ধন দেখালেন তিনবক্তা।lit-fest4

বাংলা একাডেমির নতুন ভবনের নিচ তলাতেই কে.কে স্টেজ । সেশনের নাম ‘অ্যান ইনটিমেট আর্কিটেকচার: দ্য নিউরোসায়েন্স অব অ্যাসথেটিকস’। এমন কাঠখোট্টা নামের কারণেই বোধহয় অন্যান্য সেশনের তুলনায় কিছুটা কম ছিল উপস্থিতের সংখ্যা। তবে দর্শনের যে সব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে সহজ ভাষায় কথা হলো, বোধকরি স্কুলছাত্রেরও তা বুঝতে কষ্ট হতো না।

ঢাকা লিট ফেস্টে এবার দুই তানিয়ার গল্প নিয়ে এসেছেন কলকাতার লেখিকা অন্তরা গাঙ্গুলি। বৃহস্পতিবার উৎসবের প্রথম দিনে দুপুরবেলা টিভি ব্যক্তিত্ব ইরেশ যাকেরের সঙ্গে এই বই নিয়ে বেশ স্বত:স্ফূর্ত আলাপে মেতে উঠলেন লেখিকা।

বিকাল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্রানটা: ট্রুথ অ্যান্ড লাইস’। আলোচনা করেন  ব্রিটিশ লেখিকা এ্যামি স্যাকভিলা, অ্যাঙলো-অস্ট্রেলিয়ান লেখিকা ইভি ওয়েলড। কেকে টি স্টেজে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন ভারতের কার্তিকা ভিকে। আলোচনায় সাহিত্যে সত্য-মিথ্যা এবং মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হয়।

তিনদিনের এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভিএস নাইপলের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক বিদ্যা সূর্যপ্রসাদ নাইপলের জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন বিবিসির পরিচালক এডাম লো। ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জ লাক অব ভি এস নাইপল’ নামক চলচ্চিত্রের নেপথ্যে রয়েছে নাইপলের লেখনি জীবন শুরু থেকে বর্তমানের আদ্যপান্ত। ভাগ্য নিয়ে প্রশ্ন খোদ নাইপলের নিজেরই। ত্রিনিদাদের স্কলারশিপ, লেখালেখি করে অর্জিত নিবাসের ভাগ্য,সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার ভাগ্য সবকিছু মিলেই লেখা এই চলচ্চিত্র।

কেকে টি স্টেজে ছিল অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যিক টিম কোপ, সাদিয়া দেলভি, সাইমন ব্রুটন ও শেরিং তাশি। অভিযাত্রিকদের শতবর্ষের অভিজ্ঞতা এবং ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখা ও জীবনবোধ নিয়ে আলোচনা করেন আলোচকরা।lit-fest6

বারখা দত্ত ভারতের এনডিটিভি-র কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। ২২ বছরে সাংবাদিকতা শুরু করা বারখা সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হিসেবে পদ্মশ্রীতে ভূষিত হয়েছেন। সাংবাদিকতার কাজে ঘুরে বেড়িয়েছেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, মিসরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। কাভার করেছেন সম্প্রতি হয়ে যাওয়া মার্কিন নির্বাচনও, কথা বলেছেন হিলারি ক্লিনটনের সাথে। তার সম্প্রতি প্রকাশিত বই দিস আনকোয়াইট ল্যান্ড। তবে বই ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতিই তাদের আলোচনার প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে।

এর আগে বারখা দত্তের আরেকটি প্যানেল ছিল সংসদ সসদ্য কাজী নাবিল আহমেদ, ভারতীয় লেখক শ্রীরাম কারি, মার্কিন সাংবাদিক জেফরি ইয়াং এবং মার্কিন সাংবাদিক বেন জুডাহ। আমেরিকার আর ভিন্নতা নেই এ নিয়েই শুরু হয়েছিল আলোচনাটি। তবে পুরো আলোচনার মধ্যমণি ছিলেন ডোনাল্ড যে ট্রাম্প। তাকে নিয়ে জমে ওঠে আলোচনা।

উৎসবের সব শেষ আলোচনা ছিল প্রয়াত সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ সামশুল হককে স্মরণ। এতে উঠে আসে লেখকের ব্যক্তিজীবন থেকে সাহিত্যিক জীবনসহ সব ক্ষেত্র।

দিন শেষে ‘গুরুপদে না ডুবিলে জনম যাবে অকারণ’, ‘চরণ ছেড়ো না রে চরণ’ –এর মত বিখ্যাত বাউল সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে সরগরম হয়ে উঠে বাংলা একাডেমির বটতলার নজরুল মঞ্চ। ধুপের ধোঁয়া আর মোমবাতির আলো দিয়ে সাজানো বাউল পরিবেশে একে একে সঙ্গীত পরিবেশ করলেন কুষ্টিয়ার বাউল শিল্পীরা।এসময় মঞ্চে ছিলেন কুষ্টিয়ার বাউল গুরু দরবেশ হোসেন আলী শাহ। এছাড়া আরও সঙ্গীত পরিবেশন করেন জহুরা বেগম, শাহনাজ বেল।