আজ ১৬ ই ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের এদিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ চলাকালীন সময়ে উগ্রপন্থি সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ।

কাজী আরেফের জান্ম ১৯৪২ সালের ৮ ই এপ্রিল। কাজী আরেফ ঢাকা কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার উন্মেষ ঘটে। ১৯৬০ সাল থেকেই আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার আগে তিনি পুরনো ঢাকার স্থানীয় তরুণদের নিয়ে সাহসিকতার সাথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলা করেন। এজন্য তিনি তৎকালীন সময়ে পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। দেশভাগ হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা  আন্দোলন, বৈষম্যমূলক  ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, জাতিগত নিপীড়ন প্রভৃতি ঘটনা তাঁকে প্রতিবাদী রাজনীতিতে টেনে আনে।

মেট্রিকুলেশন পাশ করার পর তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। সেখান থেকেই তিনি ভূগোল বিষয়ে বিএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগের এমএসসিতে ভর্তি হন। কিন্তু সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে তিনি সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তিনি ছাত্রলীগ করার জন্যেই নিয়মিত টিউশনি করতেন। কখনো পায়ে হেটে, কখনো বাসে চড়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যকমকে সংগঠিত করতেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন নিভৃতচারী বলিষ্ট সংগঠক।

১৯৬০ সালে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে, সিরাজুল আলম খান ও মরহুম আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিন সদস্যের নিউক্লিয়াস গঠন করেন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন পর পর দুবার। এই নিউক্লিয়াস ৬২ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর আস্থাশীল ছাত্রলীগের মাধ্যমে। নিজেকে সব সময় আড়ালে রেখে ছাত্রলীগের সব কর্মকাণ্ডে ও নিউক্লিয়াসকে দেশব্যাপী বিস্তৃত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, জয়বাংলা বাহিনী গঠন, বাংলাদেশের পতাকা নির্ধারণ, মুক্তিযুদ্ধের আগে যে সমস্ত স্লােগান জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে তা সবই বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড হিসেবে গৃহীত হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। কাজী আরেফ আহমেদ মুজিব বাহিনীর অন্যতম একজন রাজনৈতিক প্রশিক্ষক। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ছাত্রলীগের বিভক্তির পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত দৈনিক গণকণ্ঠের কার্যকরী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জাসদ গঠিত গণবাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহীদ হলে বাংলাদেশের রাজনীতি ৭১-এর পরাজিত শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। সেই সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করে ক্ষমতাসীন পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আপসহীনভাবে এগিয়ে যান।

১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে প্রত্যাবর্তন করলে নেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রেখে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি বারবার কারাবরণ করেন ও নির্যাতিত হন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন আন্দোলনে তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন ও আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বলার অবকাশ নেই যে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটে জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন একজন নেতা হিসেবে কাজী আরেফ ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।

ছাত্ররাজনীতির জীবন থেকে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন ইস্পাতের মতো দৃঢ় ও আপসহীন, সেই সময়ে কাজী আরেফ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ছিল ‘কাজী আরেফ ভাঙেন তো মচকান না। ’ তিনি ছিলেন সৎ ও সাধারণ জীবনে বিশ্বাসী একজন নির্লোভ মানুষ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এক অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশ গঠনে তিনি ছিলেন অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে হয় আমার নিজের কথা। কাজী আরেফের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই আমি ছাত্রলীগের কাউন্সিলে প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। তত্পরবর্তীতে ’৯০-এর গণ আন্দোলনে ও ’৯২-এর গণআদালত সফল করতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলাম। ১৯১৭-তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে, উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে, সাম্প্রদায়িক  ও জঙ্গিবাদের হাত থেকে মুক্ত করার যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা নিয়েছেন, সেখানে কাজী আরেফের মতো নির্মোহ নেতার প্রয়োজনীয়তা ছিল সময়ের দাবি।

অতিসম্প্রতি বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের উত্থান, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান; মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশ ক্রমশই সামাজিকভাবে ডান পন্থার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রমে মৌলবাদী শক্তির এক নীরব রক্তপাতহীন অভূত্থান ঘটেছে। পাঠ পুস্তকের এই পরিবর্তন পাকিস্তানের সামরিক জান্তাও বাস্তবায়িত করতে পারেনি। কিন্তু অতিব দু:খের বিষয় এ ব্যাপারে তরুণ সমাজ নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছে। হেফাজতে ইসলাম দাবী তুলেছে সুপ্রীম কোর্ট পাঙ্গণ থেকে ন্যায়ের প্রতীক গ্রীক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণের। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিকে গ্রাস করার চেষ্টা করছে মৌলবাদী সংস্কৃতি। এই প্রবণতা এখনেই রূখে দেওয়ার সময়। ঠিক এই মুূহূর্তে কাজী আরেফের মতো একজন বলিষ্ট সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সমাজ অনুভব করছে।

কাজী আরেফের মতো নেতা বারবার জন্মায় না। তিনি নেই, রেখে গেছেন তার অসমাপ্ত সংগ্রামী জীবন, আজ কাজী আরেফ বেঁচে থাকলে সাম্প্রদায়িক শক্তির এই পুন: উত্থান প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতেন। তাই আজকের এই প্রেক্ষাপটে কাজী আরেফের মতো একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আপোষহীন নেতার খুব প্রয়োজন ছিলো। কাজী আরেফের মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)