কতিপয় অজর অক্ষর অধ্যাপক, ঈর্ষাকাতর ব্রাহ্মণ মানসিকতার লোক, ভারি ভারি নামের ভারবাহী পাঠক আর হুইন্না মৌলবিদের হিশাবে না নিলে শিল্প রসিকরা অন্তত বাংলাদেশের শিল্প চর্চায় হুমায়ূন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মনে করে। অবশ্য তার জনপ্রিয়তা ঈর্ষা করার মতোই। এটাকে অনেকে অপরাধ হিসেবে দেখেন, অনেকে আবার এটাকে নিজের ব্যবসায় কাজে লাগিয়েছেন। তাই উন্নাসিক ঈর্ষীত ব্রাহ্মণ ও ব্যবসায়ীকে ধর্তব্য সীমার বাইরে রাখাই মঙ্গল। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তার চরম মাত্রা স্পর্শ করার সাথে গণমাধ্যম ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত। তার টিভি নাটকগুলো অভাবনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে, তাকে পরিচিতি এনে দেয়, তার বইয়ের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে। সেই সুবাদে তার আর্থিক উন্নতিও ঘটে, অভাবনীয়। এই উন্নতির ফলে তার ভেতর ঘাপটি দিয়ে থাকা সিনেমা মেকার চরিত্রটি সামনে এসে যায়। তিনি সেই সময় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি লয় করে সিনেমা তৈরিতে নেমে যান। সাথে সাথেই তার সিনেমা বানানো একটি ‘ঘটনায়’ পরিণত হয়।

তার প্রথম সিনেমা- আগুনের পরশমণি, একটি দুঃসাহসিক কাজ বলতে হবে। দুঃসাহসিক এই জন্য যে, তিনি সেই সময় সিনেমা বানানোর জন্য গল্পের বিষয় হিসেবে বেছে নেন মুক্তিযুদ্ধ, যে সময়টায় সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। শুদ্ধ তাই নয়, তিনি সরকারি অনুদানে সিনেমাটি নির্মাণ করেন। সম্ভবত প্রথম বারের মতো বাংলা সিনেমায় ফাইটিং দৃশ্য ধারনের জন্য সহায়তা নেন সেনাবাহিনীর! এসব বিস্ময়ের জন্ম দেয়, আবার দেয় না। বিস্ময়ের জন্ম দেয় কারন এটা আর কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না, আবার বিস্ময়ের জন্ম দেয় না কারন এটাই হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা আমাদের চারপাশের মানুষ। তার চরিত্ররা কম অভিনয় প্রবণ, উচ্চকণ্ঠ নয়। স্বাভাবিক চলাফেরা। তার সিনেমার চরিত্ররা ঐ চারিত্র্যটি বেশ ধারণ করে। ভারিক্কী কম, সহজ, কমিউনিকেটিভ, ইঙ্গিতের বেড়াজালে আবদ্ধ নয়, মন্তাজের ভারে ন্যুব্জ নয়। অনেকটা রবি ঠাকুরের সহজ কথা কইতে আমায় কহযে’র উল্টাপাঠ। তিনি যেন সব কথা সহজেই বলে দিচ্ছেন। হ্যাঁ, তার চরিত্ররা প্রগলভ, অনেক কথা বলে। কথায় কথায় তিনি গল্প বলেন। ভিজুয়াল গল্প। গল্প বলার যে কৌশলটি তিনি তার ফিকশন রাইটিঙে রপ্ত করেছেন, তাই যেন তিনি সিনেমা মাধ্যমে বলে যান।  হুমায়ূন কতো বড় চলচ্চিত্র নির্মাতা সেটা ভিন্ন আলোচনা হতে পারে কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে তার অবদান হল ভিজুয়াল গল্পবলার একটি নতুন মাত্রা যোগ করা। এই ক্ষেত্রেটি তাকে আবশ্যক পাঠের আওতায় নিয়ে এসেছে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখি, নাটক-সিনেমার বিরুদ্ধে সবচে বেশী যে অভিযোগটি করা হয়ে থাকে সেটি হচ্ছে, তিনি তার চরিত্রের মধ্যে বিদ্রোহের বীজ দেন না বরং কেড়ে নেন। গরীব শোষিতরা তার নির্মাণের ভেতর বিদ্রোহী না হয়ে হাস্যকর হয়ে উঠে। তার প্রতিটি নাটক সিনেমায় কাজের ছেলে মেয়ে থাকে এবং তারা তার নির্মাণের ভেতর দিয়ে হাস্যকর হয়ে উঠে। তারা নানা মজার কীর্তিকলাপ করে বেড়ায়, আড়ালে সাহেব/বিবি সাজে, আধাখাস্তা দার্শনিকতা আর কিম্ভূত পোশাক তাদের নিতান্ত জোকারে পরিণত করে রাখে। এবং এই চরিত্রদের বিকশিত হতে দেয়া হয় না।  এর পেছনে একটা কারন হতে পারে এই যে তিনি তার চরিত্রের উপর কোন আলগা ভার আরোপ করতে চাননি। কিন্তু তার সব ভিডিও ফিকশনই এই দায় বহন করে, তা কিন্তু নয়। এর একটি এন্টি স্টাডি হতে পারে তার নির্মিত তৃতীয় চলচ্চিত্র চন্দ্রকথা।

চন্দ্রকথা চলচ্চিত্রটি গ্রামের মেয়ে চন্দ্রের নামে হলেও এতে রয়েছে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। চন্দ্র (শাওন) ছাড়া অন্য তিনটি চরিত্র হচ্ছে জমিদারিহীন জমিদার সরকার সাহেব(আসাদুজ্জামান নূর), চন্দ্রের খালাত ভাই জহির (ফেরদৌস), সরকার সাহেবের ভৃত্য আমিন (আহমেদ রুবেল)। এছাড়া অন্যান্যের সাথে সরকার সাহেবের পঙ্গু-পুত্র আর পুত্রবধু, চন্দ্রের মা, গ্রাম্য শিক্ষককে দেখা যায়। এই চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ যে দৃষ্টিভঙ্গিটি নিয়ে হাজির হয়েছেন, তা অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিরোধী, সামন্তবাদ বিরোধী।

সিনেমাটা শুরু হয় জমিদারের জমিদারীর মানসিকতার দেখানোর মধ্য দিয়ে, যা সারা সিনেমায় এই মেজাজেই অব্যাহত থাকে। সিনেমাটির শুরুতেই সরকার সাহেবকে আসমানে গুলি করে কাক মারতে দেখা যায়। কিন্তু সেই মৃত কাক নিয়ে আসার সময় সরকার সাহেবের ভৃত্যর কাছে তার জমিদারি মানসিকতাকে ব্যাঙ্গ করে স্কুল মাস্টারকে বলতে শোনা যায়, “জমিদারি কোন আমলে চইলা গেছে, এখনো ভাব ধইরা বইসা আছে। ভাব দেখলে মনে হয় উনি দশ আনির জমিদার আর আমরা তার প্রজা।”

এমন কি তার কাক মারা গুলি ফুটানোতে বিরক্ত হয়ে তার ছেলে বলে বসে, “বিরাট বীর আসছে, কাউয়া মারা বীর।” এসবই সরকার সাহেবকে চরম বিরক্ত করে কিন্তু তিনি তার যাপনের বাইরে যান না। নিজের জমিদারি মানসিকতা নিয়ে নিজের মতো থাকেন। জলতরঙ্গ বাজান, নিজের রাজ্যে রাজা হয়ে বসে থাকেন।

সামাজিক পরিবর্তনের এক বিশেষ মুহূর্তে একজন ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের শিল্পবোধ, শিল্পের প্রতি দরদ, নষ্টামি, ক্ষমতা দেখানো, নারীর প্রতি লোলুপতা, নিষ্ঠুরতা সবই একটা চরিত্রের ভেতর হুমায়ূন আহমেদ দিয়েছেন। অপর দিকে প্রজন্মের জমিদার যেমন ঠিক তার উল্টা ইগোর তার ছেলে। যে কিনা বাবার এসব আচরণ সহ্য করতে পারছে না। আবার সে বিছানাবন্দি বলে কিছু করতেও অক্ষম, ফলে নানা অবদমন তার মধ্যেও রয়েছে। বাবার প্রতি তার তীব্র ঘৃণা লক্ষণীয়। জমিদার সরকার সাহেবের ভৃত্য আমিনও সেই শেষ প্রজন্মের ভৃত্য যারা প্রভুর জন্য সব করতে প্রস্তুত। সম্ভবত পৃথিবী থেকে এই ভৃত্য শ্রেণীরও বিলোপ হয়েছে, সামন্তবাদের সাথেসাথে।

সিনেমাটিতে দেখা যায় চন্দ্র জমিদার বাড়িতে দুধ দিতে যায়, আর সেই দুধ আমিন রাখে। তাদের সামান্য বাক্যালাপ হয়। আমিন তার প্রেমে পড়ে। জমিদারের অনুমতি সাপেক্ষে বিয়ে করার দিনও ঠিক হয়। অন্য দিকে চন্দ্র মজে আছে তার হৈচৈ করে বেড়ানো, কাকের মাংস খাওয়া অকর্মণ্য খালাতো ভাই জহিরের প্রেমে। বিয়ের দিন তারা পালিয়ে যায়। এদিকে আমিন আশাহত হয়ে ফিরে আসে। সেই সময়ের গ্রামে যা হবার তাই হয়। সামাজিক ভাবে মেয়ের পরিবার, পরিবার বলতে চন্দ্রের মা একা, মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় থাকে না। সে আত্মহত্যার দিকে যায়। কিন্তু জহির আর চন্দ্র বাড়ি ফেরে। তাদের একঘরে করার আয়োজন হয়। এর মধ্যেই সরকার সাহেব চন্দ্রের গলায় গান শুনে মুগ্ধ হন, দিঘির ঘাটে। চন্দ্রের পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে তিনি চন্দ্রকে বিয়ে করে নেন। বিয়ের পর তার কোথায় যাওয়া আসায় নিষেধাজ্ঞা, এমন কি চন্দ্রের সঙ্গহীন মায়ের জমিদার বাড়িতে আসা যাওয়াও নিষেধ হয়। অন্য দিকে তার প্রেমিকা ফিরে আসে গ্রামে। সে জমিদার বাড়ির আশপাশে হাঁটাহাঁটি করে, বৃষ্টি ভিজে অসুখ বানায়। ভৃত্য বিশ্বস্ততায় তার দায়িত্ব পালন করে যায়। চন্দ্রের কাছে যেমন সাড়া আশা করে সেটা না পেয়ে সরকার সাহেব ক্ষিপ্ত হতে থাকেন। সাথে পুরাতন প্রেমের প্রতি দায় আর যার সাথে বিয়ে হবার কথা সেই আমিনের প্রতি চন্দ্রের অপরাধবোধ সরকার সাহেবকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তিনি শাস্তি দেন। চন্দ্রের আঙুল সুপারি কাটার যন্ত্র দিয়ে কাটার নির্দেশ দেন আমিনকে। আমিন যথারীতি নির্দেশ মান্য করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ফুঁসতে থাকে। যা আপাত দৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও শেষ পর্যন্ত চরম রূপ নেয়। যার সাথে আমিন এক ইউটোপিয়ান সংসার পেতেছিল, তার উপর অত্যাচার, নিজের উপর মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আমিন চরম বিদ্রোহ করে বসে। এক মুহূর্তের সেই বিদ্রোহ। সরকার সাহেবের বন্দুক দিয়েই সে গুলি করে সরকার সাহেবকে। মোটা দাগে গল্পটি এই রকম।

এই গল্পের অপরাপর উপগল্পের থেকে আমিন চরিত্রের দিকে আলাদা করে ফোকাস করলে আমরা দেখতে পাই সেই প্রচলিত কথাটিই জিতে যায়। সেটা হল, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। এই সিনেমায় আপাত নিন্মবর্গের মানুষের জয় দিয়েই শেষ হয়। নিন্মবর্গের বিদ্রোহের সৌন্দর্য নিয়ে সিনেমাটি শেষ করার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ অনেক প্রশ্নের জবাব হাজির করেছে। এই এই সিনেমায় সামন্তীয় মানসিকতার নোংরামি, সামন্তবাদের এক ধরনের পরাজয়ের চিত্র আঁকা হয়েছে। সিনেমাটি দেখার পর যে কোন সাধারণ দর্শক সামন্তবাদ ও জমিদারি নষ্টামির প্রতি ঘৃণাবোধ জন্ম নিবে। হুমায়ূন আহমেদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নিয়ে যারা প্রশ্ন করেন, তাদের জন্য এই সিনেমাটি একটি উদাহরণ হতে পারে। এর বাইরে তার বানানো সিনেমাগুলোতেও তার রাজনৈতিক কমিটমেন্টের কমতি ছিলও বলে যারা বিলাপ করেন তাদের নিশ্চয়ই জানা আছে, তিনি তার প্রথম চলচ্চিত্রটি ছাড়াও ‘শ্যামল ছায়া’ নামে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি সিনেমা বানান। তাছাড়া, শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রেও গ্রামীণ ভূস্বামীকে ‘৭১সালের কৃতকর্মের জন্য মাফ চাওয়াতে দেখি।

হুমায়ূন আহমেদ মূলত স্টোরি টেলার। তিনি টেক্সট আর ভিজুয়াল এই দুই মাধ্যমেই গল্প বলেছেন। তিনি যে কাজটি করেননি সেটা হল, তার চরিত্রে  আলগা মতাদর্শ আরোপ করা। এটি তার শক্তির জায়গা। আলগা মতাদর্শ যারা চান তাদের জন্য এটা বেদনার। রাজনৈতিক গল্প নির্বাচনের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের বাইরে- চন্দ্রকথা চলচ্চিত্রটি নিয়ে কথা বলা একটু অসুবিধাজনক। তবু এটা নির্বাচন করা হল এই জন্য যে, যারা স্থূল অর্থে শিল্পে বিপ্লব বিদ্রোহ চান তাদের যেন একটু হলেও দৃষ্টি এদিকে ফেরে। এটা আমাদের প্রয়োজনেই করা দরকার। তাছাড়া এই ছবিতে জটিল এক সামাজিক স্তরবিন্যাস দেখানো হয়েছে। পূর্বতন বাংলাদেশের সমাজ, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্র, যেখানে বুর্জোয়া বিপ্লব হয় নি, হয়নি ধনতন্ত্রের সুষম সমান্তরাল বিকাশ। পূর্বতন এবং এমন কি এখনও বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসুত্রে সামাজিক সম্পর্কের বিন্যাস জটিল, বহুস্তরায়িত- সেখানে হুমায়ূন আহমেদের বর্ণনা ভঙ্গী অনেক বেশি সত্যানুগ। হুমায়ূন আহমেদ বিপ্লবী নন, বরং প্রচলিত ব্যবস্থা আরেকটু সাউন্ড হোক এটাই চাইতেন। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ভাষ্যকার। মুক্তিযুদ্ধের চলতি বয়ানে তার আস্থা ছিল। সমাজকে দেখার যে চোখ তা গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া চোখ, যদিও সমাজ অনেক বেশি জটিল এবড়ো থেবড়ো। সেই চোখে যা পড়েছে, তাই বলেছেন। এই বাস্তবতা আমাদের মানতে হবে। আগামীতে নিশ্চয়ই লোকে এসব নিয়ে বিস্তৃত কথা বলবে।

মৃত্যুর পরের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে তিনি ভাবিত ছিলেন না। আজকের বা আগামীর আলাপে ব্যক্তি হুমায়ূনের কিছু যায় আসে না। কিন্তু আজ আমাদের প্রয়োজনেই তার কাজের রাজনৈতিক সামাজিক অবস্থান নিয়ে কথা বলতে হবে, প্রয়োজন তার কাজকে নিবিড়ভাবে দেখার, তাকে নানান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার। তার মানুষ দেখার প্রস্তাবটা তিনি তার কাজেই মধ্যেই রেখে গেছেন। প্রয়াত জননন্দিত সাহিত্যিক-চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)