মৃত্যুপথযাত্রী দাদীর কণ্ঠে ৭৬ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া বা চেপে যাওয়া কুর্দিশ ভাষার গান শুনে বেরিয়ে পড়েছে জান। ফরাসিতে ‘জান’ নামের অর্থ কষ্ট। দাদী তার এ নামটি রেখেছিল। কেন রেখেছিল তা মারা যাওয়ার আগে কিছুটা জানিয়ে যায় দাদী। বাড়ির আর কেউ জানাতে চায়না আমেরিকায় থাকা তরুণ জানকে মূল ঘটনা। শেষ পর্যন্ত খালা জানায় সব ঘটনা। জান জানতে পারে ১৯৩৭-৩৮ এর গণহত্যার কথা। যার শিকার হয়েছিল তার দাদী ও তার বোন এবং তার পুরো পরিবার। সে থেকে তারা শেকড় বিচ্ছিন্ন। আত্মগ্লানি কিংবা আত্মানুসন্ধানের যাত্রা শুরু হয় জানের।

সিনেমার গল্পটি গণহত্যার। সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ১৯৩৭-৩৮ সালে তুরস্কের দারসিমে শুধুমাত্র কুর্দিশ হওয়ার অপরাধে এ গণহত্যা ঘটেছিল। যে গণহত্যায় পুরো একটি গ্রাম জনশূণ্য হয়ে পড়েছিল। ১৯৯০ সালে এর ওপর আলো পড়ে এক সমাজবিজ্ঞানী ইসমাইল বেসিকসির গবেষণাধর্মী লেখার পরে।

দারসিম ভয়াবহতার শিকার শিশুর দল

যে গণহত্যার ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় চুকনগর বা রায়েরবাজার বা শিয়ালবাড়ি গণহত্যার মত ৭১ সালে বাংলাদেশ সংঘটিত পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা ঘটে যাওয়া গণহত্যাকে।

আরো অনেক কুর্দি গণহত্যার মত এখনও গণহত্যা অস্বীকার করে তুরস্ক সরকার। তুরস্কের শেষ প্রান্তে বরফঘেরা দুর্গম পর্বতময় সংকীর্ণ উপত্যকার দারসিম ছিল বিশাল সংখ্যক ছোট গোত্র দ্বারা বেষ্টিত প্রান্তিক অস্তিত্ব। যা ছিল কুর্দিস্তানের ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যময়তার সংমিশ্রণে সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র অংশ।  ১৯৩০ সালের এক পরিসংখ্যানে যেখানে জনসংখ্যা ছিল ৬৫-৭০ হাজার।

দারসিম ঘটনায় অনেক কুর্দি শিশুকে কোথায় নিয়েছিল তুরস্কের সরকার তা আজও অনাবিস্কৃত রয়ে গেছে। ধারণা করা হয় ১২ হাজার মানুষকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। ১০ হাজার মানুষকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল ।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি দারসিমে গণকবর খনন করে ৮টি খুলি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় এ গণকবরটিতে দুই পরিবারের ২৪ জনকে জীবন্ত জ্বালিয়ে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। হত্যার ৭৭ বছর পর  পরিবারের সদস্য, সরকারী প্রসিকিু্টর এবং বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে উন্মোচিত হয় নিষ্ঠুর সত্যের অবগুণ্ঠন।

অসাধারণ, অনির্বচনীয় এবং অভাবনীয় ১১০ মিনিটের যাত্রাপথের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ১৬ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। মধ্য পৌষের সন্ধ্যা। কানায় কানায় পূর্ণ জাতীয় জাদুঘর এর মূল মিলনায়তন উপভোগ করেছে তুরস্কের নির্মাতা কাজিম ওজর এর ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘জার’। উৎসবের উদ্বোধনী দিনের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র পুরোটাই উপভোগ করেছেন তিন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অনুষ্ঠানের সভাপতি ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

প্রদীপ জ্বেলে উৎসব উদ্বোধন

চলচ্চিত্র প্রদর্শীর আগে প্রদীপ জ্বেলে উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘সিনেমার মানোন্নয়নে এই উৎসব কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছে। উৎসবটি গত কয়েক বছর ধরে প্রতিবছর অুনষ্ঠিত হচ্ছে। এটি ধরে রাখতে ট্রাস্টি বোর্ড বা নির্দিষ্ট সরকারী বরাদ্দ, যা যা ব্যবস্থা প্রয়োজন তা আমি করব।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতি এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উৎসবকে স্থায়ী করতে প্রধান অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করে ট্রাষ্টি বোর্ড গঠনের দাবী জানান। তিনি তার বক্তব্যে জানান, এই উৎসব বাংলাদেশকে বিশ্বে ইতিবাচক পরিচয়ে পরিচিত করে তুলেছে। বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসব ক্যালেন্ডারে রেইনবো আয়োজিত এই উৎসব আলাদা মর্যাদার আসন গড়ে নিয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার বক্তব্যে বলেন, লিঙ্গসমতাময়-জঙ্গীবাদমুক্ত এবং ভারসাম্যমূলক জলবায়ুর বিশ্ব গড়ে তুলতে চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতে আরো বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং এশিয়ান জুরি বোর্ডের সদস্য গিরিশ কাসারাভালি এবং উৎসব পরিচালক আহমদ মুজতবা কামাল।

প্রদীপ প্রজ্বলনের আগে গানের দল সর্বনাম চারটি নিজেদর লেখা ও সুর করা লোক সঙ্গীত পরিবেশন করে। অুনষ্ঠানে আগত অতিথিরা উপভোগ করেছেন ৭ সদস্যের সর্বনাম এর গান। গানগুলোর শিরোনাম ছিল ‘ঝাঁপ দিয়েছি’, ‘গানের দশা, ‘খেসারি শাক’ প্রভৃতি। গান করছে সর্বনাম

৯ দিন ব্যাপী উৎসবে ৬৪টি দেশের ২১৬ টি চলচ্চিত্র রাজধানীর পাঁচটি ভেন্যুতে প্রদর্শিত হবে। উৎসব উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের ৯৫ জন বিদেশী অতিথি রাজধানীতে অবস্থান করবেন।

ছবি : জাকির সবুজ এবং সংগ্রহ