কমিউনিটি রেডিওতে কমিউনিটি কোথায়? অর্থাৎ এসব রেডিও স্টেশনে কমিউনিটির মানুষের অংশগ্রহণ কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে বা হচ্ছে – এরকম প্রশ্ন নানা সময়ে নানা ফোরামেই করা হয়। প্রশ্নটি যৌক্তিক এবং এ নিয়ে যেসব ভুল ও বিভ্রান্তিকর ধারণা রয়েছে, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে বর্তমানে ১৭টি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৫ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। আর এসব অনুষ্ঠান তৈরি অর্থাৎ বিষয়বস্তু নির্ধারণ, নির্মাণ এবং সর্বোপরি পরিবেশনার প্রতিটি ধাপেই যারা কাজ করেন, তাদের সবাই সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির মানুষ। কমিউনিটির বাইরে থেকে কারও এখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।

তারা নিজেরাই সংবাদ ও অনুষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ, অনুষ্ঠানের নির্মাণ, শব্দ সম্পাদনার মতো কাজ করে থাকেন। আবার কমিউনিটির ভেতর থেকেই নারী ও দলিতদের বাছাই করা হয় ফেলোশিপের জন্য।

সংবাদ ও অনুষ্ঠানের বিষয়ও স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো কোনো বিষয় নিয়ে সংবাদ ও অনুষ্ঠান নির্মিত হলেও সেটির সঙ্গে ওই কমিউনিটির স্বার্থ যুক্ত রয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়।

সম্প্রচারকারীরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে উঠে আসার ফলে তারা নিজেরা সহজেই তাদের কমিউনিটির প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করেন। কমিউনিটির মানুষের  জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন। স্থানীয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, সংস্কৃতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। যাপিত জীবনের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজেন।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত কমিউনিটি রেডিওগুলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে উপজীব্য করে, কমিউনিটির মানুষের নিজস্ব ভাষায় সিংহভাগ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে আসছে। খাদ্য, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে স্থানীয়করণের ফলে কমিউনিটির মানুষ সহজেই জানতে পারছেন কোথায় কোন সেবা মিলবে। কার কাছে যেতে হবে। কোন সেবা পাওয়ার জন্য কী করতে হবে। আবার কোথাও সরকারি কাজে অনিয়মের খবর পাওয়া গেলে কমিউনিটির মানুষেরাই নাগরিক সাংবাদিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে সে বিষয়ে অন্যদের সতর্ক করেন। এভাবে কমিউনিটি রেডিওগুলো ওই কমিউনিটির মানুষের নিত্যদিনের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে।

তৃণমূলের যে মানুষের কোনোদিন গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পাননি বা কখনো ভাবেননি যে, তারা রেডিওতে কাজ করবেন – তারাই এখন সম্প্রচারকর্মী। তাদের মধ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে সেলিব্রিটি। দিনে খেতে কাজ করা কৃষকই সন্ধ্যার পরে রেডিও স্টেশনের শিল্পী।

মূলত কমিউনিটিতে বসবাসরত তৃণমূল মানুষের জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়নে কমিউনিটি রেডিওর যাত্রা। যে কারণে বর্তমানে কমিউনিটি রেডিওর অনুষ্ঠানমালায় তাদের চাহিদা নিরূপণ করে তাদের পরিচালনায় অনুষ্ঠান তৈরি ও সম্প্রচারে উদ্যোগ নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, এই অনুষ্ঠানমালা স্টেশন আওতাধীন এলাকার মানুয়ের সরাসরি অংশগ্রহণে সম্প্রচার, বিষয়ভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা, এসএমএস, ফোন-ইন প্রোগ্রাম, শ্রোতা ক্লাব গঠন করে তাদের অংশগ্রহণে সরাসরি অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে কমিউনিটির মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

কেবল কমিউনিটির চাহিদানির্ভর ও সৃজনশীল অনুষ্ঠান সম্প্রচারই নয়, অনুষ্ঠানের  বিষয়বস্তু নির্ধারণ থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানে এলাকার মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণও নিশ্চিত করছে কমিউনিটি রেডিও। প্রতিটি অনুষ্ঠান নির্মাণের আগে এর উদ্দেশ্য, উদ্দিষ্ট শ্রোতা, অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ফলাফল হিসেবে সম্ভাব্য ইতিবাচক পরিবর্তনসমূহ যাচাই করা হয়।

এভাবে গ্রামীণ জনপদে তথ্য ও সংস্কৃতির এক নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে কমিউনিটি রেডিও। আবার স্থানীয় পর্যায়ের এই রেডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের যুব ও যুবনারীরা মূলধারার গণমাধ্যমের কর্মী হয়ে উঠছেন। অনেকেই এখন কাজ করছেন বিভিন্ন টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রের ঢাকা অফিসে। স্থানীয় মানুষের ভাষায় তাদের সুখ-দুঃখের গল্প তুলে আনায় অনেকেই পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ ‘বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিও: কণ্ঠহীনের কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক যে পলিসি ব্রিফ বা গবেষণাপত্র তৈরি করেছে, সেখানেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কমিউনিটি রেডিওর ব্যবস্থাপনা ও উপদেষ্টা কমিটিতে কমিউনিটির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, ভূমিহীন জনগণ, কৃষক, জেলে, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, আইনজীবীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। নিয়মিতভাবে তারা অনুষ্ঠানের ইস্যু ও মান উন্নয়ন এবং সম্প্রচার সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, কমিউনিটি রেডিওগুলোতে কমিউনিটির প্রচুর লোক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী, কমিউনিটির প্রান্তিক বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার যুব সম্প্রদায়। সংবাদ ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বয়স ও সম্প্রদায়ের লোকদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়; বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান কিংবা টকশোতে অতিথি ও বক্তা হিসেবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের রেডিওতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া নাটক, গান ও আবৃত্তি ও  মেধা অন্বেষণমূলক অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে।

গবেষক এস এম মোর্শেদ কমিউনিটি রেডিও কার্যক্রমে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্তকরণ নামে যে সহায়িকা তৈরি করেছেন, সেখানেও তিনি উল্লেখ করেছেন, কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের বিগত সময়ে রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা প্রশংসনীয়। রেডিও এর অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও সংবাদ প্রচারে কোনো রেডিও স্টেশন কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বাধার সম্মুখীন হয়নি, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তিনি কমিউনিটি রেডিওগুলো কিভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে পারে, সে বিষয়ে কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছেন।

কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। সবগুলো কমিউনিটি রেডিওতেই কমিউনিটির নারীরা স্বেচ্ছাসেবক এবং নিজস্ব কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এমনকি একাধিক কমিউনিটি রেডিও স্টেশনের ম্যানেজার, সংবাদ ও অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হচ্ছেন নারী – যারা ওই কমিউনিটিরই মানুষ।

স্থানীয় যুবনারীদের মধ্য থেকে বাছাই করে ফেলোশিপ দেয়া হয়। এমনকি সমাজের একেবারে প্রান্তিক দলিত কমিউনিটি থেকেও নারীদের ফেলোশিপ দেয়া হচ্ছে, যারা বিভিন্ন রেডিও স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন। তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। তাদের সম্পর্কে সমাজের মানুষের ধারণা বদলে যাচ্ছে।

ভৌগলিক অঞ্চলের ভিত্তিতে সারাদেশে কমিউনিটি রেডিওগুলোর মধ্যে দু’টি অ্যালায়েন্স বা নেটওয়ার্ক গঠিত হতে যাচ্ছে।  একটি দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কমিউনিটি রেডিওগুলো এবং অপরটি দেশের উপকূলীয় কমিউনিটি রেডিওগুলোকে নিয়ে। এর ফলে কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ আরও বাড়বে এবং রেডিওতে জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)