আঠারো শতকে বাংলায় ঘটে যাওয়া সামাজিক বিপ্লবের শত বছর পরও বাঙ্গালি সমাজে নারী পুরুষ সম্পর্কের প্রাচীন ধারাই বিদ্যমান ছিলো। নারী পুরষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন হের ফের হয়নি। ঔপনিবেশকালে বাঙ্গালি সমাজে নারী পুরুষ সম্পর্ক খুব সহজ ছিলো না আজকের মতো। সামজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে এই সম্পর্ক যেমন জটিল ছিলো, তেমনি ছিলো নানান অসামাঞ্জস্যতায় প্রকট। ঊনিশ শতকে বাংলার নারী পুরুষ সম্পর্কের গভীরে গিয়ে লেখিকা বিলকিস রহমান ঢাকা, কলকাতা, লন্ডনের লাইব্রেরি ঘেঁটে তুলে এনেছেন এক অসামন্য প্রামানিক তথ্যভাণ্ডার। এই গবেষণা কর্মটি একটি দু:সাধ্য সাধন। লেখিকাকে ছুটতে হয়েছে ঢাকা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে দিল্লী, দিল্লী থেকে লন্ডনের মিউজিয়ামে,লাইব্রেরিতে। ঔপনিবেশকালের সকল দলিল দস্তাবেজ এসব জায়গাতেই সংরক্ষিত আছে।

ঊনিশ শতকের রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সম্প্রদায়, সমাজ সংস্কৃতি প্রভৃতি নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের নিরিখে বাংলায় ওই শতকের নারী পুরুষ সম্পর্কের যে গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিপাত, তা বিলকিস রহমানের এই গবেষণাটি দালিলিক উৎকর্ষতায় নতুনভাবে উদঘাটিত হয়েছে। কেমন ছিলো তৎকালীন সমাজে নারী পুরুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা নব্য বাঙ্গালি বাবু সমাজের শিক্ষিত নারীর সামাজিক অবস্থান অথবা তাদের যৌনজীবন? এই সম্পর্কের বিস্তারিত ব্যাখ্যায় লেখিকা দেখিয়েছেন ততকালীন বাঙ্গালী সমাজের ভিতর বাইরের নানা জটিল সম্পর্কের চিত্র। ঊনিশ শতক বলতে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দকাল অবিভক্ত বাঙ্গালী সমাজের রূপরেখা এঁকেছেন লেখিকা তার গভীর মনোনিবেশ আর তথ্যউপাত্তের সাহায্যে। এই গবেষণা কর্মটি লেখিকা মূলত পাঁচ অধ্যায়ে তুলে এনেছেন। সনাতন মূল্যবোধ, বিবাহপূর্ব প্রণয় সম্পর্ক, পরিবারের মধ্যে দাস্পত্য সম্পর্ক, বিবাহ বহির্ভূত নারী পুরুষ সম্পর্ক এবং পরিবর্তিত পারিবারিক মূল্যবোধ। সনাতন মূল্যবোধ অধ্যায়ে লেখিকা দেখিয়েছেন সহস্র বছরের প্রাচীন সংস্কার আর সদ্য জেগে ওঠা ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব সংঘাতে সৃষ্ট আর্থসামজিক পরিবেশের চিত্র।যা একইসঙ্গে তৎকালীন বাঙ্গালী সমাজের নতুন অভিঘাত তৈরি করেছে।

ইংরেজ আমলে পাশ্চাত্য প্রভাবেও বাঙ্গালির অন্দর মহলে সনাতনি সংস্কার নারীকে করে রেখেছিল অবগুণ্ঠিত। ধর্মের নামে, সনাতনী সংস্কারের নামে বাঙ্গালী নারীদের অন্তপুরে বন্দি করে রাখত তৎকালীন পুরুষ সমাজ। পক্ষান্তরে পুরুষেরা নির্বিবাদে চালিয়েছে তাদের যত সামাজিক অনাচার। আমরা এও দেখি পাশ্চাত্য সমাজের আলো এস পড়লেও এই পুরুষেরা আরো বেশি গোঁড়ামির আশ্রয় নেয়। সনাতনী মূল্যবোধের খাড়া কেবল বঙ্গালী নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো। পুরুষদের পরনারী গমন কিংবা বহু বিবাহ এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। নারীর উপর বড় ধরণের নির্যাতনের হাতিয়ার ছিলো এই সনাতন মূল্যবোধ। ঊনিশ শতকের সাহিত্যে ও সামজিক আন্দোলনে এই মূল্যবোধ বড় ধাক্কা খায় রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরদের হাতে। এই সময় বাঙ্গালী নারী পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরণের রদবদল হতে শুরু করে। যা দৃশ্যমান পরিবর্তনে খুব একটা আশাব্যাঞ্জক না হলেও বস্তুত তখনি বাঙ্গালী নারী জাগরণের সূত্রপাত হয়। বাংলা সাহিত্য ও সমাজ আন্দোলনে পরবর্তী সময় এই জাগরণের অভিধা অন্যভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে বলে লেখিকা উল্লেখ করেছেন। লেখিকা এখানে তার সুগবেষনায় তুলে এনেছেন সনাতনী সংস্কারের নামে নারী দমনের চিত্ররূপ। বিবাহ পূর্ব প্রণয় সম্পর্ক ব্যাপারটিতো ছিলো আরো কঠিন এক বিষয়। এই ব্যাপারে পুরুষেরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করে গেছে। মানে এ ক্ষেত্রেও নারীরা ছিলো পুরুষদের আধিপত্যবাদের শিকার। প্রাচীন ভারতে নারী পুরুষ সম্পর্কে নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রাচীন ভারতে নারী পুরুষ সম্পর্ক মানে ছিলো কামের সম্পর্ক। যদিও কামকে নীচ বিষয় হিসেবে দেখা হত না।’ গবেষক বিলকিস রহমান এখানে প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে এই সত্য তুলে এনেছেন যে, বাংলায় নারী পুরুষ সম্পর্ক কখনোই ভারসাম্য রক্ষা করে চলেনি। বিবাহপূর্ব প্রণয়ে বাঙ্গালী নারীদের সম্পর্কে বলা হতো ব্যাভিচার। যা কখনোই পুরুষদের বিষয়ে বলা হত না। বিবাহউত্তরও পুরুষদের বহু রমনীগমন এক ধরণের বৈধতা পায়।

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় পশ্চিমা অভিঘাতে সৃষ্ট উপাদানগুলো পরবর্তী সময় বাংলার নারী জাগরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।বইটির দুর্বল দিক হচ্ছে ঊনিশ শতকের গ্রামীন বাংলার কোনো চিত্র নেই। অবশ্য তৎকালীন গ্রাম বাংলার সামজিক দলিলের অপ্রতুলতা এখানে গবেষকের সীমাবদ্ধতা নয়।

বিবাহ বর্হিভূত নারী পুরুষ সম্পর্ক তৎকালীন বঙ্গ সমাজে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো। এ ক্ষেত্রেও ধর্ম বা সনাতন সংস্কার বা সামাজিক মূল্যবোধ কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। প্রান্তিক জীবনেও এর উদাহরণ নিয়ে তৎকালীন কবি সাহিত্যিকদের তির্যক রচনা আজো দলিল হিসেবে রয়ে গেছে। গবেষিকা এখানে তুলে এনেছেন তার সমস্ত অনুসন্ধানী দলিল।

বিলকিস রহমানের গবেষণা গ্রন্থটির শেষ পর্যায়ে আছে পরিবর্তিত পারিবারিক মূল্যবোধ। এখানে লেখিকা ঊনিশ শতকের সনাতন ধর্মে, মুসলিম ধর্মে বিয়ের কাবিননামা নিয়ে চমৎকার গবেষণা করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার এই আধিপত্যবাদী মানস বিয়ের কাবিননামায় প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। গবেষিকা এখানে বাঙ্গলি মুসলিম সমাজের নারী পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু  আলোচনা করেননি। নব্য বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারী পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজের আশানুরূপ চিত্র আমরা পাইনি। কলকাতা কেন্দ্রিক বাবু সমাজের যাবতীয় কর্মকাণ্ডই এখানে উল্লেখিত হয়েছে।

এই বইটি ঊনবিংশ শতকে সৃষ্ট বাঙ্গালী নবজাগরণের প্রাক সামাজিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি প্রামানিক দলিল হিসেবে গবেষকদের নতুন আগ্রহের সৃষ্টি করবে। বিলকিস রহমান প্রচুর পরিশ্রম করে একটি প্রামাণিক দলিল উপস্থাপন করেছেন।

ঊনিশ শতকে বাংলার নারী পুরুষ সম্পর্ক: বিলকিস রহমান

প্রকাশক: বাংলা একাডেমি

প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী