বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে অন্যতম কালজয়ী একটি নাম ‘কোথাও কেউ নেই’। বিশেষ করে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাকের ভাই। এই চরিত্রটি তৎকালীন সময়ে তরুণ তরুণীদের মধ্যে রীতিমত আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলো। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ধারাবাহিক প্রচার হয় নাটকটি। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত নাটকটি পরিচালনা করেন বরকত উল্লাহ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’। মূলত এই নাটকের প্রধান চরিত্রে বাকের ভাইয়ের জন্যই নাটকটি কালজয়ী হতে পেরেছে বলে মনে করেন অনেকেই। যে চরিত্রে অভিনয় করে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন, তিনি আসাদুজ্জামান নূর। নাটকে তরুণদের কাছে তুমুল গ্রহনযোগ্যতা আদায় করে নেয় বাকের ভাই। যে কারণে আদালত যখন তার ফাঁসির রায়ের ঘোষণা দেয় তখন দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো। নাটকের কাহিনী নিয়ে মানুষের এমন কাণ্ডকারখানা পৃথিবীতে বিরল!

ভাবছেন, হঠাৎ বাকের ভাই প্রসঙ্গ কেন? বলছি,নাটকের কাহিনীতে বাকের ভাইয়ের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ১৯৮৫ সানের ১২ই জানুয়ারি, ভোর পাঁচটায়। আর এই হিসেবে, ১২ জানুয়ারি শুক্রবার বাংলা নাটকের অবিস্মরণীয় এই চরিত্রের মৃত্যু দিন!

এমন ঘটনা সবারই জানা যে, হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ। রমনা থানায় নিরাপত্তা চাইতে হয়েছিল নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ এবং এর প্রযোজককেও। কিন্তু এমন ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন বাকের ভাইয়ের প্রধান সঙ্গী বদি ভাই?

বাকের ভাইয়ের মৃত্যুদিনে চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি ভাই খ্যাত অভিনেতা আব্দুল কাদের। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির ঘোষণার পর তৎকালীন সময়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিলো জানিয়ে তিনি বলেন, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার ঘোষণাতেই মানুষ মারাত্মক ক্ষেপে গিয়েছিলো। ফাঁসির রায় কার্যকরের পনেরোদিন আগে থেকেই রাজপথে মিছিল করেছিলো উত্তেজিত জনতা, যেন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি না দেয়া হয়। স্লোগান ছিলো এরকম,‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।’ ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, জবাব চাই।’

বাকের ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার অপরাধে নিজের বিরুদ্ধেও জনতার স্লোগান শুনতে হয়েছিল জানিয়ে এই অভিনেতা বলেন,আমিতো সাক্ষী ছিলাম। তো আদালতে সাক্ষী দেয়ার আগে আমার নামেও মিছিল বের হয়। অবশ্য আমাকে মিছিলে রীতিমত হুমকিই দেয়া হতো। আমাকে উদ্দেশ্য করে এরকম স্লোগান দিত,‘বদি তুমি সাক্ষি দিলে ভাসবে তুমি খালে বিলে।’ এমনকি আমার বাসার সামনেও পোস্টার ছাপা হয়।

বাকের ভাইয়ের ফাঁসির দিনে দেশের অবস্থার কথা বর্ণনা করে বদি খ্যাত আব্দুল কাদের আরো বলেন, চারদিকে যখন বাকের ভাইয়ের পক্ষে মিছিল স্লোগান,তখন আমরা সবাই একসঙ্গে বসে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা হুমায়ূন ভাইকে বলতাম যেন বদির ফাঁসি না হয়। কিন্তু হুমায়ূন ভাই দুষ্টুমি করতেন। তিনি ভাষণের মত বলতেন, বাকেরের ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না। বিশ্বাস করবেন না, যেদিন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়, সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই সারা শহর রীতিমত শ্মশান হয়ে যায়। সবাই টিভির সামনে বসে যায় এদিন। দেশে একেবারে কারফিউয়ের মতো অবস্থা ছিলো।

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার পরের অবস্থা জানিয়ে এই অভিনেতা বলেন, যেদিন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলো সেদিন হুমায়ূন ভাই নিজের বাসায় থাকলেন না। অন্য কোথাও ছিলেন। তার বাসা ঘিরে ফেলেছিলো মানুষ। আমি সাক্ষী দিয়েও বিপদে পড়লাম। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির পর আমার বাসায় ফোন আসতে থাকলো। হুমকি দিলো আমাকে। বললো রাস্তায় বেরুলে আমার গাড়ি ভেঙে ফেলবে। একটা নাটক নিয়ে এমন উন্মাদনা ছিলো মানুষের মধ্যে।

শুধু তাই না, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কার্যকরের পর তার কুলখানিও করলো অনেকে। এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, বাকের ভাইয়ের ফাঁসির পর নানা উন্মাদনার মধ্যে আরেকটা কাজ করলো। বাকের ভাইয়ের কুলখানির আয়োজন করলো তরুণদের একটা দল। আর সেই কুলখানির কার্ড আসলো আমার বাসায়। অভাবনীয় সব কাণ্ড কারখানা। এগুলো বলে বোঝানো যাবে না।